ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভয়াবহ গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে জানা গেছে, কাশ্মীরের নওগাঁও এলাকায় পাওয়া একটি উর্দু ভাষার পোস্টার থেকেই এই ঘটনার সূত্রপাত। সেই পোস্টারটি অনুসন্ধান করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী এমন এক চক্রের সন্ধান পায়, যাদের সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ ও আনসার গজওয়াত-উল-হিন্দ (AGuH)-এর যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
২৬ দিন আগে কাশ্মীরের নওগাঁও এলাকায় একটি সবুজ হেডলাইনের পোস্টার দেখা যায়। ভাঙা উর্দুতে লেখা সেই পোস্টারে স্থানীয়দের সরকারপন্থী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় এবং এটিতে জইশ-ই-মোহাম্মদের নাম ব্যবহার করা হয়।
পোস্টারটির উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ প্রথমে শনাক্ত করে ইরফান আহমেদ নামে ২৪ বছর বয়সী এক ইসলামি পণ্ডিতকে, যিনি শোপিয়ান জেলার বাসিন্দা। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ খোঁজ পায় আদিল রাঠার নামের এক চিকিৎসকের, যিনি কুলগামের ওয়ানপোরায় থাকতেন। পরে উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাঠারের জবানবন্দিতে উঠে আসে আরও এক চিকিৎসকের নাম—মুজাম্মিল শাকিল গণাই, যিনি ফারিদাবাদের আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের দাবি, তাঁর ভাড়া করা দুটি বাড়ি থেকে ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা জানান, দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লা সংলগ্ন এলাকায় সোমবার বিকেলে একটি সাদা রঙের স্পোর্টস কার বিস্ফোরিত হয়, যাতে ১৩ জন নিহত হন।
গাড়িটি চালাচ্ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে ডা. উমর নবি নামের আরেক কাশ্মীরি চিকিৎসক।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, এক তরুণ কালো মুখোশ পরে গাড়িটি চালাচ্ছেন। পরে হঠাৎই এক হলুদ আলো ঝলসে ওঠে—তারপরই ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
ঘটনার পরপরই কাশ্মীর জুড়ে কঠোর অভিযান শুরু করে ভারতীয় পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী। শুধু কুলগাম জেলাতেই প্রায় ৪০০টি তল্লাশি অভিযান চালানো হয় এবং ৫০০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
অভিযুক্ত উমর নবি ও মুজাম্মিল গণাই—দুজনই কাশ্মীরের কুলগাম জেলার কোইল গ্রামের বাসিন্দা। নবি’র পরিবার জানিয়েছে, তিনি একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং সম্প্রতি বাড়ি ফেরার কথা জানিয়েছিলেন।
বিস্ফোরণের পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন শহরে ইসলামোফোবিয়া ও কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বৈরিতা বাড়ছে।
গুরগাঁও পুলিশ স্থানীয় হাউজিং সোসাইটিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কাশ্মীরি ভাড়াটিয়াদের তালিকা তৈরি করতে, যা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাশ্মীরিদের উচ্ছেদ ও সহিংসতার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট ভাইরাল হচ্ছে।
ছাত্র অধিকারকর্মী নাসির খুহামি বলেন,
“ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কাশ্মীরি ছাত্র পড়াশোনা করছে। তারা এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ আতঙ্কে।”
ভারতীয় পুলিশ বলছে, এটি একটি “আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক”, যা পাকিস্তান থেকে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, একে ঐতিহ্যগত নিয়োগের চেয়ে ‘বন্ধুত্ব ও মতাদর্শভিত্তিক সংগঠিত সহমত’ বলা বেশি উপযুক্ত।
নয়াদিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের পরিচালক অজয় সাহনি বলেন,
“এটা ক্লাসিক রিক্রুটমেন্ট নয়। বরং একদল শিক্ষিত মানুষ একই বিশ্বাস বা বন্ধুত্বের সূত্রে যুক্ত হয়েছে।”
এই বিস্ফোরণ ভারতের কাশ্মীরনীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
কয়েক মাস আগেই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছিলেন, কাশ্মীরে সশস্ত্র সংগঠনে ‘শূন্য নিয়োগ’ চলছে।
কিন্তু দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনা সেই দাবিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।