সিরিয়ার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফরে গেছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা।
রোববার (৯ নভেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই সফর সিরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, বিশেষত আইএসআইএল (ISIS) বিরোধী বৈশ্বিক জোটে সিরিয়ার সম্ভাব্য যোগদানকে ঘিরে আলোচনাই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
শনিবার রাতেই রাজধানী ওয়াশিংটনে পৌঁছান প্রেসিডেন্ট আল-শারা। তার আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়—
দেশব্যাপী আইএসআইএল সেলের বিরুদ্ধে বৃহৎ নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছে। এই অভিযানে ইতিমধ্যে ৭১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে।
সোমবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আল-শারার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
১৯৪৬ সালে সিরিয়ার স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো সিরিয়ান প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন— যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
গত মে মাসে রিয়াদে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করেছিলেন আল-শারা; এর পর শুক্রবারই তাকে মার্কিন সন্ত্রাসী নিষেধাজ্ঞা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া-বিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক আশা প্রকাশ করেছেন—
“আল-শারা এই সফরে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক আইএসআইএল বিরোধী জোটে যোগদানের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন।”
এছাড়া রয়টার্স ও এএফপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দামেস্কের একটি বিমানঘাঁটিতে সামরিক উপস্থিতি স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যে নিরাপত্তা সমঝোতা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
১৩ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শেষে সিরিয়ার পুনর্গঠনই এখন সরকারের মূল লক্ষ্য।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশ পুনর্গঠনে অন্তত ২১৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
আল-শারা এই সফরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন, যাতে পুনর্গঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা যায়।
প্রেসিডেন্ট আল-শারা একসময় আল-কায়েদার সিরিয়ান শাখার নেতৃত্বে ছিলেন, তবে এক দশক আগে তিনি আইএসআইএল থেকে পৃথক হয়ে যান এবং পরবর্তীতে সংঘর্ষেও জড়ান।
তার নেতৃত্বাধীন সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম (HTS) কে গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী তালিকা থেকে সরিয়ে নেয়— যা তার বর্তমান বৈধতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন আল-শারা—
দীর্ঘ কয়েক দশকে এটি ছিল প্রথমবারের মতো কোনো সিরিয়ান প্রেসিডেন্টের জাতিসংঘে ভাষণ।
এর পর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের মাধ্যমে তার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করা হয়।
সিরিয়া আজ মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক।
একসময় বিচ্ছিন্ন থাকা দেশটি এখন আন্তর্জাতিক জোটে ফিরে আসার চেষ্টা করছে।
আল-শারার যুক্তরাষ্ট্র সফর কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সিরিয়ার আন্তর্জাতিক পুনরুত্থানের এক প্রতীকী পদক্ষেপ।