গাজার প্রধান সীমান্তপথ রাফাহ ক্রসিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদেশে চিকিৎসা নিতে অপেক্ষমাণ হাজারো রোগী এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। সীমান্তটি বন্ধ থাকায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে অনেক রোগীর অসুস্থতা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
গাজার রাজধানী গাজা শহর-এর বাসিন্দা লামা আবু রেইদা ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে আশা করেছিলেন, তার অসুস্থ শিশু কন্যা আলমার জীবন বদলে যেতে পারে। মাত্র পাঁচ মাসের কম বয়সী আলমা শ্বাস নিতে অক্সিজেন মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসকেরা তাকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। পরিবারের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল—ব্যাগ গুছানো, চিকিৎসা নথি প্রস্তুত—শুধু বাকি ছিল গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত পার হওয়া এবং সেখান থেকে জর্ডান গিয়ে অস্ত্রোপচার করানো।
কিন্তু নির্ধারিত যাত্রার একদিন আগে ইসরায়েল নিরাপত্তা কারণ দেখিয়ে গাজার সব সীমান্ত “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত” বন্ধ করে দেয়। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর ঘটনাও ঘটে। এই সিদ্ধান্তে ভেঙে যায় আবু রেইদা পরিবারের আশা।
বর্তমানে আলমা দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতাল-এ তিন মাসের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাধীন। তার মা দিন-রাত মেয়ের পাশে থাকছেন। তিনি বলেন, “আমার মেয়ে অক্সিজেন ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। অক্সিজেন না পেলে সে দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।”
রাফাহ সীমান্ত দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকায় গাজার হাজারো রোগী বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন। এরই মধ্যে অনেক পরিবার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। গাজার বাসিন্দা হাদিল জরোব জানান, তার দুই সন্তান—ছয় বছরের সোহাইব ও আট বছরের লানা—একটি বিরল জেনেটিক রোগে আক্রান্ত ছিল। তারা বিদেশে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছিল, কিন্তু সীমান্ত বন্ধ থাকায় সেই সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই সন্তানকেই হারান তিনি।
হাদিল জরোব বলেন, “আমি আমার সন্তানদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে মারা যেতে দেখেছি, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি।” তার দাবি, যদি বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ মিলত, তাহলে হয়তো তাদের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২০ হাজারের বেশি রোগী বিদেশে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ক্যানসার রোগী এবং প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শিশু রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৪৪০টি গুরুতর রোগীর জীবন বাঁচাতে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন এবং প্রায় ৬ হাজার আহত ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া জরুরি।
মানবাধিকার সংগঠনআল-দামির অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটস রাফাহ সীমান্ত বন্ধ রাখাকে গাজার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে এক ধরনের সমষ্টিগত শাস্তি বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বহু রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং গাজার মানবিক সংকট আরও গভীর করছে।
এদিকে ক্যানসারে আক্রান্ত গাজার বাসিন্দা আমাল আল-তালুলি বলেন, সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের আগে চিকিৎসা নেওয়ার পরও তার স্তন ক্যানসার আবার ফিরে আসে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বর্তমানে বাস্তুচ্যুত হয়ে আত্মীয়দের বাড়িতে বসবাস করছেন।
আমাল বলেন, গাজায় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মারাত্মক সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু চাই সীমান্ত খুলে দেওয়া হোক, যাতে আমরা চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে পারি এবং আমাদের বেঁচে থাকার একটি সুযোগ পাই।”
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.