ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দ্বীপটির কয়েকটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এর জবাবে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনায় আঘাত হানা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সম্পৃক্ত তেল স্থাপনাগুলোকে “ছাইয়ের স্তূপে” পরিণত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। খার্গ দ্বীপ থেকেই ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন বাহিনী খার্গ দ্বীপের সব সামরিক লক্ষ্যবস্তু “সম্পূর্ণ ধ্বংস” করে দিয়েছে এবং এটিকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বোমা হামলা বলে উল্লেখ করেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। তিনি আরও বলেন, আপাতত দ্বীপটির তেল অবকাঠামো ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত তিনি নেননি। কিন্তু যদি ইরান বা অন্য কেউ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচলে বাধা দেয়, তাহলে তিনি সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানায়, মার্কিন হামলার সময় খার্গ দ্বীপে ১৫টিরও বেশি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সূত্রের বরাতে বলা হয়, হামলাগুলো মূলত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি নৌঘাঁটি এবং বিমানবন্দর স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়। তবে তেল অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। বিস্ফোরণের পর দ্বীপ থেকে ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
এদিকে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তাহলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস শিল্পেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে জানান, প্রায় ২,৫০০ মার্কিন মেরিন সেনা এবং একটি অ্যামফিবিয়াস অ্যাসল্ট জাহাজ অঞ্চলটিতে পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট এবং যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি (এলএইচএ-৭)। এই ইউনিটগুলো সাধারণত সমুদ্র থেকে স্থল অভিযানে অংশ নিতে সক্ষম হলেও তারা দূতাবাস নিরাপত্তা জোরদার, বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্যোগ মোকাবিলায়ও কাজ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মোতায়েন এখনই স্থল অভিযান শুরু হওয়ার ইঙ্গিত না দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে যুদ্ধের জন্য সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম।
খার্গ দ্বীপে হামলার পর ট্রাম্প আবারও ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির জন্য সবচেয়ে ভালো হবে অস্ত্র সমর্পণ করা এবং যা অবশিষ্ট আছে তা রক্ষা করা। তিনি তার সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে আরও দাবি করেন, ইরান নাকি একটি চুক্তি করতে চায়, তবে সেই ধরনের কোনো চুক্তি তিনি গ্রহণ করবেন না। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১,৪৪৪ জন নিহত এবং ১৮,৫৫১ জন আহত হয়েছেন। দেশটির বিভিন্ন শহর, যেমন তেহরান, কারাজ, ইসফাহান ও তাবরিজে বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে পাল্টা হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, প্রয়োজনে তারা তাদের উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করবে, যার মধ্যে “হেইদার” ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। এই অস্ত্র দিয়ে তারা ইসরায়েলি ভূখণ্ড এবং অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.