বর্তমানে রোজা ও ঈদ পালনের সময় নির্ধারণ নিয়ে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন ধরনের মতভেদ ও বিভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। এই বিভ্রান্তি দূর করার জন্য কোরআন, সুন্নাহ এবং বিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন। ইসলামের মূল নির্দেশনা অনুযায়ী রমজান মাস শুরু এবং ঈদ নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হলো চাঁদ দেখা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَمَنۡ شَهِدَ مِنۡكُمُ الشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُ
“অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন এতে রোজা পালন করে।”
(সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫) এ আয়াতের ব্যাখ্যা হিসেবে হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন,صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ
“তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ কর। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে শাবান মাসকে ৩০ দিন পূর্ণ কর।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৯)
ফিকহের আলেমগণও সাধারণভাবে চাঁদ দেখার ভিত্তিতেই রোজা ও ঈদ পালনের কথা বলেছেন। ইসলামের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানরা নিজ নিজ অঞ্চলে চাঁদ দেখেই রোজা ও ঈদ পালন করে আসছেন, যা মুসলিম সমাজে একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত।
পৃথিবীর ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা যায় যে পৃথিবীর সব জায়গায় একই সময়ে দিন-রাত বা একই তারিখ থাকে না। পৃথিবী ২৪টি সময় অঞ্চলে বিভক্ত এবং বিভিন্ন স্থানের দ্রাঘিমা ভিন্ন হওয়ার কারণে কোথাও দিন, কোথাও রাত থাকে। আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার কারণে একই সময়ে পৃথিবীতে দুটি ভিন্ন তারিখও থাকতে পারে। এই বাস্তবতায় পুরো পৃথিবীতে একই সময়ে একটি চন্দ্র তারিখ বিদ্যমান থাকা বাস্তবিকভাবে কঠিন। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাঁদ আগে দেখা যায় এবং এরপর পশ্চিমের দেশগুলোতে সন্ধ্যা হলে সেখানেও চাঁদ দেখা সম্ভব হয়। অন্যদিকে পৃথিবীর পূর্বাঞ্চলের অনেক দেশে তখন গভীর রাত থাকতে পারে, ফলে সেখানে একই সময়ে চাঁদ দেখা সম্ভব হয় না। এ কারণেই অঞ্চলভেদে রোজা ও ঈদের তারিখে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী রোজা ও ঈদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো নিজ এলাকায় চাঁদ দেখা বা নিকটবর্তী এলাকার নির্ভরযোগ্য সংবাদ পাওয়া। যদি কোনো কারণে চাঁদ দেখা না যায় এবং গ্রহণযোগ্যভাবে চাঁদের সংবাদও পাওয়া না যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট মাসকে ৩০ দিন পূর্ণ করতে হবে। শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের উপর ভিত্তি করে রোজা-ঈদ পালন করার কথা ইসলামী শরিয়তে নির্ধারিত হয়নি। এছাড়া রোজা বা ঈদ নির্ধারণের জন্য শুধু চাঁদের আকাশে উপস্থিতি যথেষ্ট নয়; বরং চাঁদের দৃশ্যমান হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো দেশে চাঁদ দৃশ্যমান না হলে তারা শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী মাস ৩০ দিন পূর্ণ করবে।
সব দিক বিবেচনায় দেখা যায় যে নবী করিম (সাঃ) এর যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের অনুসৃত পদ্ধতি হলো নিজ নিজ অঞ্চলে চাঁদ দেখে বা নির্ভরযোগ্য সংবাদ পেয়ে রোজা ও ঈদ পালন করা। এই পদ্ধতিই কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাস্তবতার দিক থেকেও অধিক যুক্তিযুক্ত। তাই মুসলিম সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি ও মতভেদ দূর করার জন্য কোরআন-সুন্নাহর এই নির্দেশনাকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করা প্রয়োজন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে দ্বীন বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.