ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে গাজা উপত্যকার পরিবহন অবকাঠামো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার সড়ক নেটওয়ার্কের প্রায় ৮১ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এতে বহু এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং মৌলিক পরিবহন সেবা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাজা সিটির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হাসান এল-নাবিহ প্রতিদিন সকালে একটি সাইকেলে করে বের হন—বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পাওয়া যায় এমন কোনো জায়গা খুঁজতে, যাতে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। যুদ্ধের আগে সাইকেলে করে অধ্যাপকের চলাচল ছিল বিরল দৃশ্য। কিন্তু গাড়ি ধ্বংস হওয়া ও জ্বালানি সংকটের কারণে সেটিই এখন বাস্তবতা। তিনি জানান, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শুজাইয়া এলাকায় তার গাড়িটি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর আর নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য হয়নি।
যুদ্ধের আগে গাজার সড়কে বাস, ট্যাক্সি, মোটরসাইকেল আর ব্যক্তিগত গাড়ির ভিড় লেগে থাকত। এখন বহু সড়ক ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে আছে, অনেক জায়গা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে মোটরযান চলাচল অসম্ভব। আবু মোহাম্মদ জুন্দিয়েহ নামের এক চালক বলেন, “আগে গাড়িই ছিল আমার আয়ের উৎস। এখন সেটা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দাম বেশি, জ্বালানি নেই, এমনকি হাঁটাও কঠিন।”
রাফাহ সীমান্ত আংশিক খোলার সময় যেসব রোগী ও মানুষ বের হতে পেরেছেন, তাদের অনেককেই পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। মোটরযান চলাচল প্রায় অচল।
যুদ্ধের কারণে সাইকেলের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু নতুন সাইকেল পাওয়া যাচ্ছে না। গাজা সিটির জাল্লা স্ট্রিটে আবু লুয়াই হানিয়েহ একটি ছোট মেরামতের দোকান চালান। তিনি বলেন, “যুদ্ধের আগে সাইকেল বিক্রি করতাম। এখন শুধু পুরোনো সাইকেল মেরামত করি।” আগে ২০০ ডলারের কম দামে যে সাইকেল পাওয়া যেত, এখন সেটার দাম ১ হাজার ডলারের বেশি।
পরিবহন সংকটে ডেলিভারি সেবাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। হামামা ডেলিভারি নামের একটি প্রতিষ্ঠান এখন পুরোপুরি সাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। তাদের ব্যবস্থাপক আবু নাসের আল-ইয়াজজি বলেন, “আমাদের বেশিরভাগ মোটরসাইকেল ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ৫০ জন কর্মী যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এখন আমরা সাইকেলে প্লাস্টিকের ঝুড়ি লাগিয়ে খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিই।”
ডেলিভারি কর্মী আহমদ (২৩) আগে আইন পড়তেন। এখন তিনি সাইকেলে করে খাবার ও কাপড় পৌঁছে দেন। তিনি বলেন, “যুদ্ধের শুরুতে মা বলেছিলেন, সাইকেল কিনে ফেলো। এখন বুঝছি সেটাই বাঁচার পথ। সাইকেল না থাকলে মানুষ কার্যত আটকে পড়ে।”
গাজার মানুষদের জন্য সাইকেল এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়—এটাই বেঁচে থাকার অবলম্বন।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.