ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সময়ে আরব সাগরে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ফলে কূটনৈতিক সংলাপ চললেও সামরিক উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি—এমন ইঙ্গিত মিলছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, “এই মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।” তবে আলোচনা কোথায় হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে চাননি। তিনি বলেন, “আলোচনা চলছে বিভিন্ন জায়গায়। তারা কিছু করতে চায়, দেখা যাক কী হয়।”
এ সময় ট্রাম্প আগের এক সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “তাদের আগেও একটি সুযোগ ছিল, কিন্তু সেটা কাজে লাগেনি। এরপর আমরা ‘মিডনাইট হ্যামার’ চালিয়েছিলাম। আমি মনে করি, তারা সেটা আবার হতে দেখতে চায় না।” উল্লেখ্য, গত বছরের জুনে ‘মিডনাইট হ্যামার’ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে চাপ দিয়ে আসছে। সম্প্রতি ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের ঘটনায়ও তেহরানের ওপর নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ওয়াশিংটন। গত সপ্তাহে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়, যার ফলে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে যুক্ত হয় প্রায় ৫,৭০০ মার্কিন সেনা। তাদের সঙ্গে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা তিনটি ডেস্ট্রয়ার ও তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ যোগ দেয়। তবে সাম্প্রতিক দিনে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের উদ্যোগে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
এর মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, তিনি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে “ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক আলোচনা” চালানোর জন্য। তবে তিনি শর্ত দেন, “উপযুক্ত পরিবেশ থাকতে হবে এবং আলোচনা অবশ্যই জাতীয় স্বার্থের কাঠামোর মধ্যে হতে হবে।”
এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থেকে উড্ডয়ন করা একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সেন্টকমের দাবি, ড্রোনটি আত্মরক্ষার্থে এবং রণতরী ও এতে থাকা সেনাদের সুরক্ষার জন্য ভূপাতিত করা হয়েছে।
সেন্টকম জানায়, শাহেদ-১৩৯ মডেলের ওই ড্রোনটি ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত মার্কিন রণতরীর দিকে “আক্রমণাত্মকভাবে” এগিয়ে আসছিল। ডি-এস্কেলেশনের চেষ্টা করা হলেও ড্রোনটি জাহাজের দিকে উড়ে আসা অব্যাহত রাখে।
এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য আসেনি। তবে ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে জানায়, একটি ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যদিও সেটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কাছে সফলভাবে তথ্য পাঠাতে পেরেছিল। কেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো, তা তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার পর সেন্টকম আরও জানায়, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌযান ও একটি মোহাজের ড্রোন হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে হয়রানি করেছে। তাদের দাবি, দুটি নৌযান দ্রুতগতিতে জাহাজটির কাছে আসে এবং সেটি দখলের হুমকি দেয়।
ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থা অবশ্য ভিন্ন দাবি করে। তারা জানায়, একটি জাহাজ অনুমতি ছাড়া ইরানি জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। সতর্ক করার পর সেটি এলাকা ত্যাগ করে এবং কোনো বড় নিরাপত্তা ঘটনা ঘটেনি।
এমন ঘটনার মধ্যেও আলোচনার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট ফক্স নিউজকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনার স্থান নির্ধারণে তুরস্ক, ওমানসহ কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদেরও আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ রাখছি, যাতে পরিস্থিতি শান্ত রাখা যায় এবং অঞ্চলকে আরও বড় সংঘাত থেকে রক্ষা করা যায়।”
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান চায় আলোচনা ওমানে অনুষ্ঠিত হোক, তুরস্কে নয়, এবং আলোচনার পরিধি শুধু পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকুক। তবে যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করতে আগ্রহী।
গত বছর ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাঁচ দফা আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর সেগুলো স্থগিত হয়। তেহরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি বলেন, ইরান বাস্তবভিত্তিক পন্থায় আলোচনায় যেতে চাইলেও আলোচনার বিষয়বস্তু এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে বড় কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, “ওয়াশিংটন বা তেহরান—কোনো পক্ষই তাদের অবস্থান শিথিল করার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। তাই আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এবার যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি সামরিক শক্তি প্রদর্শন করছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি ইরানকে দ্রুত চুক্তিতে আনতে চাপ সৃষ্টি করার কৌশল, নাকি দীর্ঘমেয়াদি কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ?”
সব মিলিয়ে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চললেও সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তাই এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.