১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো বাংলাদেশ। শহর থেকে গ্রাম, শ্রমজীবী থেকে তরুণ সমাজ—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একটাই প্রত্যাশা, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের দায়িত্বে আসুক একটি নির্বাচিত সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পর পরাজিত দল বা জোটকে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্র ও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
আমিনবাজারের ভাঙাব্রিজ এলাকায় সময় সংবাদের সঙ্গে কথা হয় মোতালেব নামে এক জেলের। শীতের সকালে সাভারের এই জেলে প্রতিদিনের মতোই দলবল নিয়ে মাছ ধরতে নামেন। উন্মুক্ত সরকারি জলাশয় থেকে যা মাছ পাওয়া যায়, তা বিক্রি করেই চলে তার সংসার।
দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জেলে পেশায় যুক্ত থাকলেও আজও জেলে কার্ড পাননি মোতালেব। নতুন সরকারের কাছে তার একমাত্র চাওয়া—একটি জেলে কার্ড এবং বেকার মৌসুমে সামান্য সহায়তা।
মোতালেব বলেন,
“পৌষ, মাঘ আর ফাল্গুন—এই তিন মাস আমরা প্রায় বেকার থাকি। এই সময় সরকার যদি একটু সহযোগিতা করতো, তাহলে পরিবার নিয়ে কোনোরকমে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারতাম। যে সরকারই আসুক, আমাদের চাওয়া—বেকার সময়ে যেন সরকার আমাদের খোঁজ রাখে।”
মোতালেবের দলের আরেক সদস্য বাদলও চান একটি সুষ্ঠু নির্বাচন।
তিনি বলেন,
“১৫ বছর ভোট দিতে পারিনি। এবার অন্তত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে চাই। আমার চাওয়া শুধু একটি সুষ্ঠু ভোট।”
এই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে এমনই সাধারণ মানুষ। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মায়সারা বেগমও একজন শ্রমজীবী প্রতিনিধি। চলতি বছর এক বিঘা জমিতে সবজি চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন তিনি। কিন্তু বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় সেই লাভ খুব একটা কাজে আসেনি। স্বামী মারা গেছেন প্রায় ২০ বছর আগে। অথচ এখনো পাননি বয়স্কভাতা বা বিধবাভাতা।
মায়সারা বেগম বলেন,
“এত বছরেও কোনো ভাতা পাইনি। এখন চাই এমন একটা সরকার, যারা দেশের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং আমাদের মতো মানুষের খোঁজ রাখবে।”
গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকা মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে হলেও জীবনের বাস্তবতা এখানে ভিন্ন। শহরের জীবন যান্ত্রিক ও আত্মকেন্দ্রিক হলেও এখানেই একসময় জন্ম নিয়েছিল ২৪-এর অভ্যুত্থানের মতো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন। রাজপথে রক্ত ঝরানো বন্ধুদের স্বপ্ন কি এবার পূরণ হবে—এই প্রশ্ন ঘুরছে তরুণদের মনে।
তরুণ সমাজ বলছে, অনেকেই জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছে। এই অনুভূতি তাদের কাছে আলাদা। তারা প্রত্যাশা করছে, এবার নিজেদের পছন্দের জনপ্রতিনিধিকে স্বাধীনভাবে নির্বাচিত করতে পারবে।
বিগত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের জন্য সুখকর ছিল না। তাই সব দিক বিবেচনায় ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকরাও একই কথা বলছেন। তাদের মতে, নির্বাচন যদি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন তুলি বলেন,
“দেশের স্বার্থে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা জরুরি।”
বৈষম্য বিলোপের যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তার অন্যতম বাস্তব প্রকাশ হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তাই সবার জন্য সমান সুযোগ রেখে নতুন দিনের সূচনা হোক—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.