কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রকাশিত মার্কিন নথির জেরে ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসন লেবার পার্টির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, দলের জন্য “আরও বিব্রতকর পরিস্থিতি” তৈরি না করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রোববার রাতে লেবার পার্টির মহাসচিব হোলি রিডলিকে লেখা এক চিঠিতে ম্যান্ডেলসন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দলের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই তদন্ত প্রক্রিয়া চলাকালে তিনি দল থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
চিঠিতে ম্যান্ডেলসন লেখেন, “গত সপ্তাহান্তে আবারও আমাকে জেফ্রি এপস্টেইন ঘিরে সৃষ্ট জনরোষের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে আমি গভীরভাবে দুঃখিত। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি আমাকে আর্থিক অর্থ প্রদান করেছিলেন—এমন অভিযোগ উঠেছে, যা আমি মিথ্যা বলে মনে করি এবং যার কোনো স্মৃতি বা নথি আমার কাছে নেই। বিষয়টি আমি নিজেই তদন্ত করতে চাই। এই প্রক্রিয়ায় লেবার পার্টিকে আর বিব্রত করতে চাই না।”
তিনি আরও লেখেন, “যেসব নারী ও কিশোরী দীর্ঘদিন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের কাছে আমি আবারও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করছি। লেবার পার্টির আদর্শ ও সাফল্যের জন্য আমি সারাজীবন কাজ করেছি। দলটির স্বার্থেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ শুক্রবার যে নথিগুলো প্রকাশ করেছে, তাতে এপস্টেইনের ব্যাংক হিসাব থেকে ম্যান্ডেলসনের নামে তিন দফায় মোট ৭৫ হাজার ডলার পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২৫ হাজার ডলার করে তিনটি লেনদেন হয় ২০০৩ ও ২০০৪ সালে।
ব্যাংক স্টেটমেন্টে “Peter Mandelson” নামটি ‘BEN’ (Beneficiary) হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। তবে ম্যান্ডেলসন এসব নথির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, “আমি এসব অর্থ পাওয়ার কোনো স্মৃতি বা প্রমাণ পাইনি এবং নথিগুলো আসল কি না, সেটিও আমি জানি না।”
এছাড়া নথিতে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে ম্যান্ডেলসনের স্বামী রেইনালদো অ্যাভিলা দা সিলভা এপস্টেইনের কাছে ১০ হাজার পাউন্ড আর্থিক সহায়তা চান, যা একটি অস্টিওপ্যাথি কোর্স ও অন্যান্য খরচে ব্যবহারের কথা ছিল।
এই ঘটনায় যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করে বলেছে, ম্যান্ডেলসনকে দল থেকে বহিষ্কার না করে তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রকাশ করে।
এক বিবৃতিতে কনজারভেটিভ মুখপাত্র বলেন, “ম্যান্ডেলসনের রাষ্ট্রদূত নিয়োগের পেছনে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত। তার এপস্টেইন-সম্পর্কিত অতীত জেনেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।”
অন্যদিকে, লেবার সরকারের মন্ত্রী স্টিভ রিড বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে যারাই সম্পর্ক রেখেছেন, তাদের সবারই নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে সত্য প্রকাশ করা। তিনি বলেন, “যে-ই হোক—লর্ড ম্যান্ডেলসন বা অন্য কেউ—তাদের কাছে যা তথ্য আছে, তা প্রকাশ করা উচিত।”
প্রকাশিত নথিতে আরও দেখা যায়, ২০০৯ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের সরকারের ব্যবসামন্ত্রী থাকা অবস্থায় ম্যান্ডেলসন এপস্টেইনের অনুরোধে ব্যাংকারদের বোনাস সংক্রান্ত নীতিমালা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন বলে ইমেইলে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া প্রকাশিত নথিতে ম্যান্ডেলসনের ব্যক্তিগত কিছু ছবিও রয়েছে, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এসব ছবি সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি ছবির স্থান বা প্রেক্ষাপট কিছুই মনে করতে পারছি না।”
লেবার পার্টির এক মুখপাত্র বলেন, “দলের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং দলীয় বিধি অনুযায়ী তদন্ত করা হয়।”
বর্তমানে ম্যান্ডেলসন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব থেকে অপসারিত হয়েছেন এবং হাউস অব লর্ডসের কার্যক্রম থেকেও বিরত রয়েছেন। তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.