গাজা ও মিসরের মধ্যকার রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর সীমিত পরিসরে পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। সোমবার (৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট ফেজ) এই ক্রসিং খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক সংস্থার অধীনস্থ দপ্তর সিওজিএটি (COGAT)। তবে এই পথ ব্যবহার করে কেবল পায়ে হেঁটে চলাচল করা যাবে এবং তা হবে কঠোর নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে।
সিওজিএটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাফাহ ক্রসিং দিয়ে গাজাবাসীদের প্রবেশ ও প্রস্থান—দুই দিকের চলাচলই সীমিত আকারে শুরু হবে। পুরো কার্যক্রম মিসর ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হবে। সংস্থাটি জানায়, “আজ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কাল থেকে গাজার বাসিন্দাদের সীমিত যাতায়াত চালু হবে।”
এই ঘোষণার আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, রাফাহ ক্রসিংয়ে যাতায়াতকারীদের তল্লাশি ও যাচাইয়ের জন্য একটি নতুন স্ক্রিনিং কমপ্লেক্স নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়েছে।
রাফাহ ক্রসিং হলো গাজার একমাত্র সীমান্তপথ, যা ইসরায়েলের ভূখণ্ড অতিক্রম না করেই মিসরের সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধের আগে এটি ফিলিস্তিনি ও মিসরীয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পরিচালনা করত, ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি বাহিনী রাফাহ দখল করার পর থেকে ক্রসিংটি কার্যত বন্ধ ছিল।
আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ দক্ষিণ গাজার খান ইউনুস থেকে জানান, রাফাহ ক্রসিং পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা ও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, “মানুষ গাজা ছাড়তে চায়, কিন্তু তারা ভয় পাচ্ছে—একবার বের হলে আর ফিরতে পারবে কি না। অনেকে বলেছেন, তারা শুধু চিকিৎসা বা পড়াশোনার জন্য যেতে চান এবং পরে আবার গাজায় ফিরতে চান।”
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানান, ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় গাজা ছেড়ে যাওয়া অন্তত ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি এখন ফিরে আসতে চাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রায় ২২ হাজার আহত ও অসুস্থ মানুষ জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, প্রথম ধাপে অন্তত ৫০ জন ফিলিস্তিনি রোগী রোববারই মিসরে প্রবেশ করবেন। পরবর্তী কয়েক দিনে প্রতিদিন প্রায় ২০০ জন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা গাজা থেকে মিসরে যাবেন এবং প্রতিদিন ৫০ জন গাজায় ফিরবেন।
মিসর ও ইসরায়েলের অনুমোদনপ্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী এই যাতায়াত পরিচালিত হবে। এএফপি প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, মিসরের সীমান্তে সারি সারি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে আহত ও অসুস্থদের গ্রহণের জন্য।
রাফাহ ক্রসিং দিয়ে গাজা ছাড়তে চাওয়া মানুষের মধ্যে রয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী ক্যানসার রোগী আবেদ এল হালিম আবু আসকার। চার বছর ধরে ক্যানসারে ভুগছেন তিনি। ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর অস্ত্রোপচারের কথা ছিল, কিন্তু তার আগেই যুদ্ধ শুরু হওয়ায় চিকিৎসা স্থগিত হয়ে যায়।
যুদ্ধের প্রথম মাসেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন তাঁর ২৮ বছর বয়সী মেয়ে শাইমা, জামাতা এবং দুই নাতনি।
আবু আসকারের ছেলে আহমেদ আল জাজিরাকে বলেন,
“দুই বছর চার মাস ধরে বাবা চিকিৎসার অপেক্ষায় আছেন। প্রতিদিন বলা হয় সীমান্ত খুলবে, ধৈর্য ধরুন। কিন্তু কিছুই হয়নি। এখন ওষুধ নেই, পরীক্ষা করার সুযোগ নেই—কারণ ইসরায়েল সব হাসপাতাল ধ্বংস করেছে।”
রাফাহ ক্রসিং পুনরায় চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের অন্যতম শর্ত ছিল। তবে অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে।
রোববারও গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। খান ইউনুসের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, রাফাহ শহরের উত্তর-পশ্চিমে ড্রোন হামলায় ৬৩ বছর বয়সী খালেদ হাম্মাদ নিহত হন। মধ্য গাজার ওয়াদি গাজা এলাকাতেও আরেকজন নিহত হয়েছেন।
এর আগের দিন শনিবার উত্তর ও দক্ষিণ গাজায় একাধিক বিমান হামলায় অন্তত ৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৫১১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪০৫ জন আহত হয়েছেন।
রাফাহ ক্রসিং সীমিতভাবে খুললেও ত্রাণ প্রবেশ নিয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। জাতিসংঘের হিসাবে, গাজার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রতিদিন অন্তত ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রয়োজন।
এর মধ্যেই নতুন করে সংকট তৈরি করেছে ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত—ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ)–এর কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা। ইসরায়েলের দাবি, এমএসএফ তাদের স্থানীয় কর্মীদের পূর্ণ তালিকা জমা দেয়নি।
ইসরায়েলের প্রবাস ও ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী মন্ত্রণালয় জানায়, এই শর্ত সব মানবিক সংস্থার জন্য প্রযোজ্য। এর আগে ডিসেম্বরে ইসরায়েল ৩৭টি ত্রাণসংস্থাকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল।
লন্ডনভিত্তিক জরুরি চিকিৎসক জেমস স্মিথ আল জাজিরাকে বলেন,
“এটি ইসরায়েলের সহায়তা ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারেরই অংশ। তারা ১ হাজার ৭০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যকর্মী হত্যা করেছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে।”
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.