মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের প্রতি অসীম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি মানুষের গুনাহ মাফ করার জন্য নানা সময় ও সুযোগ নির্ধারণ করেছেন, যাতে মানুষ অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। এমনই একটি বরকতময় সময় হলো শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা আমাদের সমাজে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত। কোরআনুল কারিমে একে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী এবং হাদিসে একে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুন নিস্ফ মিন শাবান’।
বর্তমান সমাজে এক শ্রেণির মানুষ বিরোধিতা করতে গিয়ে শবে বরাতের গুরুত্বই অস্বীকার করে বসেছে এবং একে বিদআত বলে আখ্যা দেয়। অথচ কোরআন ও সহিহ হাদিসে এ রাতের ফজিলত, তাৎপর্য ও করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। নিচে সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হলো—
হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—
“অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলের প্রতি দয়ার দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক-বিদ্বেষী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান, হা. ৫৬৬৫)
হাদিস বিশারদ আল্লামা নূরুদ্দীন হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।
এ বিষয়ে হজরত আবু বকর (রা.), আলী (রা.), আবু হুরাইরা (রা.), আয়েশা (রা.)-সহ বহু সাহাবি থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিলেন। তিনি বলেন,
“এ রাতটি অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি বিশেষ দয়ার দৃষ্টি দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন।”
(শুআবুল ইমান)
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
“১৪ শাবানের রাতে তোমরা ইবাদত করো এবং পরদিন রোজা রাখো। কারণ এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে বলেন— কে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব; কে রিজিক চাইবে, আমি তাকে রিজিক দেব; কে রোগমুক্তি চাইবে, আমি তাকে সুস্থ করব।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ১৩৮৮)
হাদিস বিশারদগণের মতে, এ হাদিস ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি বরকতময় রাতে। এ রাতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়।”
(সুরা দুখান: ২-৩)
কিছু মুফাসসিরের মতে, এখানে উল্লিখিত ‘বরকতময় রাত’ দ্বারা শবে বরাত বোঝানো হয়েছে।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,
“অর্ধ শাবানের রাতে সকল সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় এবং শবে কদরে তা দায়িত্বশীল ফেরেশতাদের কাছে অর্পণ করা হয়।”
(তাফসিরে কুরতুবি)
হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে আরও বর্ণিত—
“এ রাতে নির্ধারণ করা হয় কার জন্ম হবে, কার মৃত্যু হবে, কার রিজিক কত হবে এবং কার আমল গ্রহণ করা হবে।”
শবে বরাতে বেশি বেশি করা উচিত—
✔ তওবা ও ইসতিগফার
✔ তাসবিহ-তাহলিল
✔ দরুদ শরিফ
✔ কোরআন তেলাওয়াত
✔ নফল নামাজ
✔ দোয়া ও মুনাজাত
✔ কবর জিয়ারত
এ রাতে অন্তর থেকে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন পেশ করা এবং উম্মাহর জন্য দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
শবে বরাত আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা, রহমত ও বরকতের বিশেষ রাত। এ রাতকে গাফিলতায় নষ্ট না করে ইবাদত ও দোয়ায় কাটানো প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণকর।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এ বরকতময় রজনীর যথাযথ কদর করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.