তাওরাতে বনি ইসরাইলের প্রতি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, শনিবার (ইয়াওমুস সাবত) দিনটি সম্পূর্ণভাবে ইবাদত-বন্দেগির জন্য নির্ধারিত থাকবে। এ দিনে দুনিয়াবি কাজকর্ম, বিশেষ করে মাছ শিকার করা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
কিন্তু বনি ইসরাইলের একদল লোক প্রকাশ্যে এই আদেশ অমান্য না করে কৌশলের আশ্রয় নেয়। তারা শনিবার সরাসরি মাছ ধরত না; বরং সেদিনই জাল ও গর্ত বসিয়ে রাখত, যাতে মাছ আটকা পড়ে। এরপর রবিবার তা তুলে নিত। বাহ্যিকভাবে তারা শরিয়তের বিধান মানছে বলে মনে হলেও বাস্তবে তারা আল্লাহর আদেশের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করছিল।
এই অবাধ্যতা ও প্রতারণার ফলেই আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর ভয়াবহ শাস্তি নাজিল করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَقَدْ عَلِمْتُمُ الَّذِينَ اعْتَدَوْا مِنْكُمْ فِي السَّبْتِ فَقُلْنَا لَهُمْ كُونُوا قِرَدَةً خَاسِئِينَ
“আর অবশ্যই তোমরা জান তাদের কথা, যারা তোমাদের মধ্য থেকে শনিবারের বিধান লঙ্ঘন করেছিল। অতঃপর আমি তাদের বলেছিলাম—তোমরা লাঞ্ছিত বানরে পরিণত হও।”
(সুরা আল-বাকারা: ৬৫)
প্রখ্যাত মুফাসসিরদের মতে, এটি কোনো রূপক শাস্তি ছিল না; বরং ছিল প্রকৃত শারীরিক রূপান্তর। আল্লাহ তাআলা তাদের মানুষের আকৃতি বিকৃত করে বানরের আকৃতিতে পরিণত করেন। তবে তাদের চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতি মানুষের মতোই ছিল।
তারা একে অপরকে চিনতে পারত, একে অপরকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ত, অনুতাপে ছটফট করত—কিন্তু কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।
ইমাম ইবনু কাসির (রহ.) উল্লেখ করেন,
তাদের অন্তর ও উপলব্ধি মানুষের মতোই ছিল, কিন্তু বাহ্যিক আকৃতি বানরের মতো করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে শাস্তি আরও লাঞ্ছনাকর হয়।
(তাফসির ইবনু কাসির, সুরা বাকারা: ৬৫)
বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, এই রূপান্তরিত লোকেরা তিন দিনের বেশি জীবিত ছিল না। তারা কোনো খাদ্য গ্রহণ করেনি এবং তাদের কোনো বংশধরও হয়নি। তিন দিনের মধ্যেই সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হজরত দাউদ (আ.)-এর যুগে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَجَعَلْنَاهَا نَكَالًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهَا وَمَا خَلْفَهَا وَمَوْعِظَةً لِلْمُتَّقِينَ
“অতঃপর আমি এ ঘটনাকে তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত এবং মুত্তাকিদের জন্য উপদেশ বানিয়েছি।”
(সুরা আল-বাকারা: ৬৬)
এই ঘটনা আমাদেরকে সুস্পষ্ট শিক্ষা দেয়
আল্লাহর বিধানের সঙ্গে চালাকি করা বা হিলাহ (কৌশল) অবলম্বন করা মারাত্মক অপরাধ। আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য হলো বাহ্যিক আমল নয়, বরং খাঁটি আনুগত্য ও আন্তরিক তাকওয়া।
অতীত জাতির ইতিহাস কেবল গল্প নয়; বরং তা সব যুগের মানুষের জন্য সতর্কবার্তা—
যাতে আমরা আল্লাহর আদেশকে ফাঁকি না দিয়ে সত্যিকার অর্থে তাঁর আনুগত্য করি।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.