গাজা শহরের পূর্বাঞ্চলে হলুদ রঙের কংক্রিট ব্লকের খুব কাছেই ছোট একটি তাঁবুতে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি জাইদ মোহাম্মদ। চার সন্তানের এই বাবা জানান, ইসরাইলি সেনাদের নতুন করে নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর পাশেই এখন তাদের বসবাস।
‘ইয়েলো লাইন’ বলতে সেই সীমারেখাকে বোঝানো হচ্ছে, যেখানে গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরাইলি বাহিনী পিছু হটেছিল। ইসরাইলি সামরিক মানচিত্র অনুযায়ী, এই লাইন গাজার পূর্ব সীমান্ত থেকে ভেতরে ১.৫ থেকে ৬.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এতে গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা অন্তর্ভুক্ত।
এই সীমারেখা গাজাকে কার্যত দুই ভাগে ভাগ করেছে—
পূর্বাঞ্চল পুরোপুরি ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে, আর পশ্চিমাঞ্চলে ফিলিস্তিনিরা তুলনামূলক কম চলাচল বিধিনিষেধের মুখে থাকলেও নিয়মিত বিমান হামলা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
জাইদের তাঁবুটি দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি পাড়ায়, যেখানে চোখ যত দূর যায় শুধু ভাঙা ভবন আর ধ্বংসাবশেষ। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজায় জমে থাকা ৬ কোটি টনের বেশি ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে সাত বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
ইসরাইলের টানা দুই বছরের হামলায় গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ২৩ লাখের বেশি মানুষ এখন তাঁবু বা বোমায় বিধ্বস্ত ঘরে আশ্রয় নিতে বাধ্য।
জাইদ বলেন,
“চারপাশে সারাক্ষণ গোলাবর্ষণ আর গুলির শব্দ শোনা যায়। ওদিকে ইসরাইলি সেনারা মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে অবস্থান করছে। অনেক সময় বুলডোজার দিয়ে বাড়িঘর বা কৃষিজমি গুঁড়িয়ে দেয়। এই এলাকা ছাড়িয়ে কয়েক কদম এগোনোও বিপজ্জনক।”
রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় চারপাশ অন্ধকারে ডুবে থাকে। তবে ইসরাইলি বাহিনী ফ্লেয়ার ছুড়ে আকাশ আলোকিত করে, যা আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে।
ইয়েলো লাইন মূলত গাজার ভেতরে নির্ধারিত ইসরাইলি সামরিক বাফার জোন। জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধ চলাকালে এসব এলাকা বারবার সম্প্রসারিত ও সঙ্কুচিত হয়েছে, ফলে নাগরিকদের চলাচল ও জীবিকা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
ডিসেম্বরে গাজা সফরের সময় ইসরাইলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির এই রেখাকে সরাসরি “নতুন সীমান্তরেখা” বলে উল্লেখ করেন।
এর ফলে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা এখন ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে—যার মধ্যে দক্ষিণের রাফাহ ও উত্তরের বেইত হানুন শহরও রয়েছে।
যুদ্ধের সময় ইসরাইলি বাহিনী লিফলেট, ফোনবার্তা ও অনলাইন মানচিত্রের মাধ্যমে বারবার ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব নির্দেশ দেওয়া হয়েছে চলমান বোমাবর্ষণের মধ্যেই।
জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় দপ্তর জানিয়েছে, একাধিক সময় গাজার ৭০ শতাংশের বেশি এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ বা বাধ্যতামূলক উচ্ছেদ অঞ্চলের আওতায় রাখা হয়েছিল।
অনেক জায়গায় ইয়েলো লাইনের কোনো চিহ্ন বা সাইনবোর্ড নেই। মানুষ শব্দ, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে বোঝার চেষ্টা করে কোন এলাকা নিরাপদ। গতকাল নিরাপদ মনে হওয়া মহল্লা আজই হয়ে যেতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ।
ফলে পরিবারগুলো দ্রুত গুছিয়ে নেয়, অনেক সময় অক্ষত ঘর ছেড়েও পালাতে হয়। বেশিরভাগ মানুষই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অনিশ্চয়তা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ জানিয়েছে, শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, অনিদ্রা ও মানসিক ট্রমার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
শিশুরা শিখে নিচ্ছে নতুন মানচিত্র—কোন রাস্তা এড়িয়ে চলতে হবে, গোলাগুলি শুরু হলে কোনদিকে দৌড়াতে হবে।
ইয়েলো লাইন শুধু বসবাস নয়, জীবিকাকেও ছিন্ন করছে।
কৃষকেরা জমি দেখতে পেলেও সেখানে যেতে পারে না। কর্মস্থল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পড়ায় বহু মানুষ কাজ হারিয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে বা ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধ থামলেও এই রেখা থেকে যাচ্ছে মানুষের জীবনে—
কোথায় বাস করবে, কীভাবে চলাফেরা করবে, ঘর বানাতে সাহস করবে কি না—সব সিদ্ধান্তই নির্ভর করছে এই অদৃশ্য সীমারেখার ওপর।
এই রেখা মাটিতে আঁকা নয়,
কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে গভীরভাবে লেখা হয়ে গেছে।
সূত্র: আল জাজিরা