গাজা উপত্যকা নিয়ে ইসরায়েলের কৌশল এখন এক গভীর অনিশ্চয়তা ও বিভক্তির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। টানা দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা সামরিক অভিযানে গাজার অধিকাংশ আবাসন ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, নিহত হয়েছেন ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের তীব্র সংকটে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে অবরুদ্ধ এই জনপদের মানুষ।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্ত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ, যার লক্ষ্য গাজার পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা তদারকি। এতে প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েল কি সত্যিই গাজার পুনর্গঠন চায়, নাকি বর্তমান স্থবির ও নিয়ন্ত্রণমূলক পরিস্থিতিই তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য?
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সামনে পথ সহজ নয়। চলতি বছরের শেষ দিকে ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে তাকে একদিকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের গাজা-পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য দেখাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের জোট সরকার টিকিয়ে রাখার চাপও রয়েছে।
এই জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচসহ কট্টরপন্থীরা গাজার পুনর্গঠনের বিরোধী। তারা যুদ্ধবিরতি এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে কোনো স্থিতিশীলতা উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করে এবং গাজাকে ধর্মীয় অধিকার হিসেবে ইসরায়েলি বসতির উপযোগী এলাকা বলে মনে করে।
এ পর্যন্ত নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বিলম্বিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। হামাসের নিরস্ত্রীকরণ না হলেও রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে, যার ফলে গাজায় যাতায়াত আংশিকভাবে সহজ হবে।
একই সঙ্গে ইসরায়েল গাজার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত একটি ‘বাফার জোন’ তৈরিতে তৎপর, যা কার্যত গাজার ভেতরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও গভীর করবে। নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরে ফিলিস্তিনিদের সীমান্ত এলাকা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি সমাজের বিভক্ত দৃষ্টিভঙ্গি
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গভীরভাবে বিভক্ত। জনমত বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিনের মতে, গাজা নিয়ে ইসরায়েলি সমাজে একদিকে নিরাপত্তাহীনতার ভয়, অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। বেশিরভাগ মানুষ যুদ্ধ পুনরায় শুরু হোক—এটি চায় না, তবে গাজার ভবিষ্যৎ পরিচালনায় বাইরের শক্তির ওপরও আস্থা রাখতে পারছে না।
অন্যদিকে শান্তি আন্দোলনের কর্মী গেরশোন বাসকিনের ভাষায়, ইসরায়েলি রাজনীতিতে এখন কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেই—সবকিছুই নির্বাচনী রাজনীতির হিসাব-নিকাশে আটকে আছে। গাজার মানবিক পরিস্থিতি ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও জনআলোচনায় কার্যত অদৃশ্য।
ইসরায়েলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে—ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তারা চায় না। তবে গাজাকে কীভাবে সেই লক্ষ্য অনুযায়ী পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নেই।
ইসরায়েলি আইনপ্রণেতা ওফের কাসিফ অভিযোগ করেছেন, সরাসরি হামলা কমলেও গাজায় খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ সীমিত রেখে ‘নীরব ধ্বংসনীতি’ চালু রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি পরিকল্পিত সরকারি নীতির অংশ।
কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের কারণে কিছুটা আশাবাদী হলেও, বড় অংশের পর্যবেক্ষকদের মতে গাজার ভবিষ্যৎ এখনও চরম অনিশ্চিত। পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী কিংবা রাজনৈতিক সমাধান—সবকিছুই ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও স্বল্পমেয়াদি স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে আছে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গাজার জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের কোনো কার্যকর ও টেকসই পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়—এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।