জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বলেছেন, গাজায় ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ের সময় ইসরায়েলের নিষ্ক্রিয়তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—ফিলিস্তিনি জীবনকে তারা ‘ব্যয়যোগ্য’ হিসেবেই দেখে।
মঙ্গলবার আল জাজিরা আরবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলবানিজ বলেন, গাজায় আঘাত হানা প্রবল শীতকালীন ঝড়ে অন্তত সাত শিশু নিহত হয়েছে। এই দুর্যোগের ভয়াবহ প্রভাব কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং গাজার অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ফলেই পরিস্থিতি এতটা প্রাণঘাতী হয়েছে।
তিনি বলেন, “দূরে বসেও এই দৃশ্য দেখা আমার জন্য মর্মান্তিক। কাদা আর অন্ধকারের মধ্যে মানুষ বসে আছে, অস্থায়ী আশ্রয়গুলো একে একে ধসে পড়ছে—তাদের জীবন যেন নরকে পরিণত হয়েছে।”
আলবানিজ আরও জানান, প্রবল বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন অনেক পরিবার।
ঝড়টি প্রাকৃতিক হলেও এর প্রাণঘাতী প্রভাবকে রাজনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন মানবিক সংস্থার কর্মকর্তারা। ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার, যিনি বর্তমানে গাজা সিটিতে অবস্থান করছেন, নিশ্চিত করেছেন—ঠান্ডাজনিত কারণে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, শিশুরা শুধু ঠান্ডায় মারা যায়নি; বরং খাদ্য ও ওষুধের মানবসৃষ্ট সংকট তাদের প্রতিরোধক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিয়েছে।
“দুই-তিন বছরের শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে,” বলেন এল্ডার, পরিস্থিতিকে ‘চরম দুর্দশা’ হিসেবে বর্ণনা করে।
তার অভিযোগ, ইসরায়েল এখনো রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ফলে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি গতির ঝড়ো হাওয়ার মুখে পরিবারগুলো একেবারেই অসহায় হয়ে পড়ছে।
মানবিক সহায়তার ঘাটতি এবং জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আলবানিজ সরাসরি বলেন,
“ইসরায়েল সাধারণত ফিলিস্তিনি জীবনের তোয়াক্কাই করে না। বরং তারা মনে করে, এসব জীবন ধ্বংসযোগ্য।”
তিনি অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটে মনোযোগ দিয়ে গাজায় চলমান ‘গণহত্যা’ উপেক্ষা করছে—যার ফলে মানুষ ঘর, বিদ্যুৎ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়া প্রকৃতির সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
“আর কী দেখতে হবে আমাদের? এমন কী বাকি আছে যা আমরা এখনো দেখিনি?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আলবানিজ বলেন, শুধু মানবিক সহায়তা পাঠানো আর যথেষ্ট নয়, বিশেষ করে যখন সেই সহায়তাও বাধাগ্রস্ত করা হয়।
তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন ও কঠোর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তার মতে, যেকোনো সমাধানের সূচনা হতে হবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সেই মতামত থেকে, যেখানে দখলদারিত্ব অবসানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আল জাজিরার আবহাওয়া উপস্থাপক খালেদ সালেহ জানান, এই ঝড়ে মেরু অঞ্চল থেকে আসা বাতাস বইছে, যার গতি অনেকটা ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের মতো।
তিনি বলেন, “এই বাতাস গাছ উপড়ে ফেলতে পারে—তাই জীর্ণ তাঁবুগুলোর কী অবস্থা হয়, সেটা সহজেই অনুমেয়।”
অবকাঠামো ধ্বংস থাকায় বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয়কেন্দ্রেই।