ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রাণহানির সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংগঠন। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
রোববার (১১ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ (HRANA) জানায়, গত দুই সপ্তাহের সহিংসতায় অন্তত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী ও ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ। সংগঠনটি দাবি করেছে, ইরানের ভেতরে ও বাইরে থাকা তাদের কর্মীদের মাধ্যমে এসব তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
তবে ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। রয়টার্সও এই পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রে ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় এই গণবিক্ষোভের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হলে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিতে জড়াতে পারে।
রয়টার্সকে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার ইরান পরিস্থিতি নিয়ে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্র ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করা এবং সরকারবিরোধী অনলাইন তৎপরতায় সহায়তা দেওয়া।
এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, “সামরিক বাহিনী বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে, আমাদের সামনে খুব শক্ত কিছু বিকল্প রয়েছে।” তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের বিরোধী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে তার এবং শনিবার ইরানের নেতারাও নাকি আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ওয়াশিংটনকে ‘ভুল হিসাব’ না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডার কালিবাফ বলেন, “ইরানে হামলা হলে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে।”
গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ইরান সরকার এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে সোমবার দেশজুড়ে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ সমাবেশের ডাক দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে কার্যত ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্যপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় ট্রাম্প জানান, ইরানে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট চালুর বিষয়ে ইলন মাস্কের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তেহরান ও মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে রাতের বিক্ষোভ, আগুন, বিস্ফোরণের শব্দ এবং ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা গেছে, যা রয়টার্স যাচাই করেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তেহরানের করোনারের দপ্তরে সারিবদ্ধ মরদেহ দেখিয়ে দাবি করা হয়, নিহতরা ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সহিংসতার’ শিকার। একই সঙ্গে নিহতদের স্বজনদের আহাজারির দৃশ্যও প্রচার করা হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরানকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।
এরই মধ্যে সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইসরায়েলও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে দেশটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম হলেও ইরান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.