ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ আরও সংকুচিত করেছে।
মাদুরোকে আটক করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ ইরানকে সতর্ক করে বলেন, “ভেনেজুয়েলায় কী ঘটছে, তা তেহরানের গভীরভাবে লক্ষ্য করা উচিত।” তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও কারাকাস ও তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের উত্তেজনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তবে মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি পদক্ষেপ ইরান ইস্যুতেও সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) সভাপতি জামাল আবদি বলেন, “এই ধরনের আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।” তার মতে, মাদুরোকে অপসারণ ইরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং সামরিক প্রতিরোধ জোরদারের যুক্তি তৈরি করবে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মরতাজাভি বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। এতে কূটনীতির সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হচ্ছে। তার ভাষায়, “তেহরান মনে করছে, ওয়াশিংটন আলোচনার বদলে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ চায়। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে।”
মাদুরো আটক হওয়ার আগে থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলা সরকারের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্য দিয়ে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ তুলেছে এবং ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর ওয়াশিংটনের ‘অধিকার’ রয়েছে—এমন দাবিও করেছেন ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, কারাকাস মধ্যপ্রাচ্যের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে পশ্চিম গোলার্ধে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিয়েছে—যার পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
ইরান ও ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিনের মিত্র। দুই নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত দেশ একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করেছে, যার পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হয়। মাদুরোর পতনের ফলে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বলতার পর ইরানের আঞ্চলিক মিত্রজোট আরও সংকুচিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। তেহরান এই অভিযানকে “অবৈধ আগ্রাসন” হিসেবে অভিহিত করে জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, “একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন।”
অন্যদিকে, মার্কো রুবিও বলেন, মাদুরোকে আটক করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা শত্রুর কাছে মাথা নত করব না।”
এরই মধ্যে ট্রাম্প ইরানকে আবারও বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরান যদি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
মাদুরো আটক হলেও ভেনেজুয়েলায় এখনো সরকার পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ নিজেকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করে বলেন, মাদুরোই ভেনেজুয়েলার একমাত্র বৈধ নেতা। তিনি এই অভিযানের পেছনে ইসরায়েলের ভূমিকা থাকার ইঙ্গিতও দেন।
ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি না মানলে রদ্রিগেজকেও “এর চেয়েও বড় মূল্য” দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলা পরিচালনা ও দেশটির তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটনের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
কিছু মার্কিন রাজনীতিকের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ন্ত্রণে এলে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষেত্রে জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি কমবে। কারণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়, যা যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তবে বিশ্লেষক জামাল আবদি মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তেল কিছুটা সহায়তা দিলেও সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই খুব তাড়াহুড়ো হবে।