যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হয়েছেন—এমন দাবিতে বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় “বৃহৎ পরিসরের হামলার” মধ্যেই মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তবে ভেনেজুয়েলা সরকার বলছে, তারা এখনো জানে না প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীর বর্তমান অবস্থান কোথায়। শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক অডিও বার্তায় দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন,
“আমরা জানতে চাই, তারা জীবিত আছেন কি না—যুক্তরাষ্ট্রকে এর প্রমাণ দিতে হবে।”
এই নাটকীয় ঘটনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে ইতিহাসের সেই অধ্যায়গুলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বা গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে অন্য দেশের শীর্ষ নেতাদের আটক করেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদুরোর কথিত আটক সেই তালিকায় যুক্ত হতে পারে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও পানামার ম্যানুয়েল নরিয়েগার নামের পাশে।
১৯৮৯ সালে পানামায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় ওয়াশিংটন দাবি করেছিল, মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মাদক পাচার রোধের জন্য এই অভিযান জরুরি।
অভিযানের আগেই ১৯৮৮ সালে মিয়ামিতে নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র—যার সঙ্গে বর্তমান মাদুরো ইস্যুর মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
নরিয়েগাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই দীর্ঘদিন কারাভোগের পর তাকে ফ্রান্স ও পরে আবার পানামায় পাঠানো হয়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারেই তার মৃত্যু হয়।
২০০৩ সালে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ থাকার অভিযোগ তুলে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। পরবর্তীতে এসব অস্ত্রের কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।
নয় মাস পর নিজ শহর তিকরিতের কাছে একটি গর্তে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। পরে ইরাকি আদালতে বিচারের মাধ্যমে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০০৬ সালে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।
২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় নিজ বাসভবন থেকে আটক হন হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ। তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে মাদক ও দুর্নীতির অভিযোগে সাজা দেওয়া হয়।
তবে বিতর্ক সৃষ্টি হয় তখনই, যখন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন। মুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে হন্ডুরাস—যা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতার অভিযোগকে আরও উসকে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। একসময় যেসব নেতাকে বন্ধু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, পরবর্তীতে তারাই হয়ে উঠেছেন ‘শত্রু’—এমন নজির ইতিহাসে নতুন নয়।
তবে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ধরনের অভিযানের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।