বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা পেরিয়েছে ১০ বছর, কিন্তু মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ নিউ ইয়র্ক থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। চুরি হয় প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার।
দেড় মাস পর মামলা হলেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আজ পর্যন্ত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেনি। এ পর্যন্ত ৯২ বার সময় বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য থাকলেও তা পিছিয়ে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ এপ্রিল।
সিআইডির সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. শাহ আলম জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক শুরু থেকেই তদন্তে যথাযথ সহযোগিতা করেনি। তিনি বলেন,
“তিন-চারটি কম্পিউটারে সার্ভারের কাজ হতো। সেখান থেকে চুরি হওয়ার সুযোগ ছিল না। কারা সহায়তা করেছে, সেটাও আমরা শনাক্ত করেছি। তারা সার্ভার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন।”
তিনি আরও বলেন, রিজার্ভ চুরির পর মামলা করতে বিলম্ব, তথ্য গোপন রাখা এবং বিদেশি সংস্থাকে এনে আলামত নষ্ট করার মতো কাজ তদন্তকে জটিল করেছে।
২০২৪ সালে সিআইডির প্রতিবেদনে উঠে আসে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত ১২ জন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। তদন্তে দেখা যায়, তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান সুইফট সার্ভারের সঙ্গে আন্তব্যাংকিং লেনদেন ব্যবস্থা (আরটিজিএস) সংযুক্ত করার অনুমোদন দেন।
এই সংযোগকে তদন্তকারী সংস্থাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। শাহ আলম বলেন,
“সুরক্ষিত সিস্টেমকে অরক্ষিত করার যুক্তি তারা দিয়েছিল, কিন্তু সেটি আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।”
রিজার্ভ চুরি এত বড় ঘটনা হলেও পরবর্তী তিন বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। পাঁচটি দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই অপরাধের তদন্তেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিকতা ছিল কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য ও অর্থনীতিবিদ ড. জামালউদ্দিন আহমেদ বলেন,
“ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। কিন্তু সেটির কোনো ফলোআপ হয়নি, এমনকি প্রতিবেদনটিও প্রকাশ করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও মামলাটি নিয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।”
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত ফিলিপিন্সের আরসিবিসি ব্যাংক-এ থাকা ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন। তবে এখনো বাংলাদেশ ব্যাংক আশানুরূপ অর্থ ফেরত পাওয়ার কোনো ইতিবাচক বার্তা দেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন,
“মামলাটি বাংলাদেশ ও ফিলিপিন্সের মধ্যে চলমান রয়েছে।”
এক দশক পেরিয়ে গেলেও অভিযোগপত্র না হওয়া, তদন্তে গড়িমসি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকা দেশের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে। রিজার্ভ চুরির মতো গুরুত্বপূর্ণ মামলার এমন পরিণতি জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.