ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় শেষ এক বন্দির দেহাবশেষ উদ্ধারের নামে অন্তত ২৫০টি কবর খুঁড়ে ফেলার ঘটনায় অসংখ্য পরিবার নতুন করে মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। স্বজনদের কবরের কী হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে তারা আজ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
গাজা সিটির তুফাহ এলাকায় অবস্থিত আল-বাতশ কবরস্থানে এ সপ্তাহে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর খনন ও বুলডোজার অভিযানে ভেঙে পড়েছে অসংখ্য কবর। এই কবরস্থানেই সমাহিত ছিলেন ফাতিমা আবদুল্লাহর স্বামী মোহাম্মদ আল-শারাওয়ি, যিনি ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর এক ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন।
ফাতিমা বলেন,
“আমরা সবাই আতঙ্কে ছিলাম। জানতাম অভিযানটা আমাদের কবরস্থানে চলছে। মনে হচ্ছিল, পরের কবরটাই হয়তো আমার স্বামীর হবে। যন্ত্রপাতি তার কবরের দিকে এগোচ্ছে—এই কল্পনাই আমাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।”
তিনি জানান, সেনাবাহিনীর অভিযানে লাশের অংশ, হাড়গোড়, ব্যাগ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলা হয়।
“মৃতদেরও তারা রেহাই দেয়নি। কবরগুলো বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে, যেন সেগুলোর কোনো মূল্যই নেই।”
ইসরায়েলি পুলিশ সদস্য রান গিভলির দেহ উদ্ধারের সময় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ২৫০টি কবর খুঁড়ে দেখা হয়। এতে পুরোনো ও নতুন—দুই ধরনের কবরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ধ্বংস হয় অনেক সমাধিফলক, বদলে যায় কবরস্থানের পুরো চেহারা।
ফাতিমা বলেন,
“আমি সব সময় সন্তানদের নিয়ে স্বামীর কবর জিয়ারত করতাম। বাচ্চারা সেখানে গিয়ে দুঃখ পেত না, বরং মনে করত তারা বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। এখন জানি না, সেই কবর আদৌ আছে কি না।”
২০২৪ সালের জুনে শুজাইয়া এলাকা থেকে ব্যাপক উচ্ছেদের পর তিনি আর সেখানে যেতে পারেননি। যুদ্ধবিরতি হলেও কবরস্থানটি এখনো সামরিক নিয়ন্ত্রণ এলাকার পাশে থাকায় সেখানে যাওয়া বিপজ্জনক।
তিনি বলেন,
“কোন দেহাবশেষ তারা নিয়ে গেছে, কী ফিরিয়ে দিয়েছে—কেউ জানে না। আমরা গাজার মানুষজন সঠিকভাবে শোক করার সুযোগও পাইনি, এখন কবরটুকুও কেড়ে নেয়া হয়েছে।”
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী বছরের পর বছর ধরে গাজার কবরস্থানগুলোতে বোমা হামলা, খনন ও ধ্বংস চালিয়ে আসছে। ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর জানিয়েছে, গাজার ৬০টি কবরস্থানের মধ্যে অন্তত ২১টি ধ্বংস বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে অসংখ্য দেহাবশেষ হারিয়ে গেছে বা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কবরস্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বেইত হানুন, আল-ফালুজা (জাবালিয়া), আলী ইবনে মারওয়ান, শেখ রাদওয়ান, আল-শুহাদা ইস্টার্ন কবরস্থান, তিউনিসিয়ান কবরস্থান এবং সেন্ট পোরফিরিয়াস চার্চের কবরস্থান।
মাদেলিন শুকাইলা জানান, তার বোন মারাম ও চার মাসের শিশু ইয়ুমনা ২০২৩ সালের অক্টোবরে এক ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। পরে তাদের আল-বাতশ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
“আমরা বহু কষ্টে সেই কবর খুঁজে পাই। কবরফলক অক্ষত ছিল। কিন্তু এখন জানি না, তাদের দেহাবশেষ কোথায়।”
তিনি বলেন,
“এ যেন তাদের আবার হত্যা করা হলো। মৃত্যুর পরও শান্তিতে থাকতে দিল না।”
রোলা আবু সিদো জানান, তার বাবার কবর আল-শিফা হাসপাতালের অস্থায়ী কবরস্থানে ছিল। পরে ইসরায়েলি বুলডোজারে সেটিও মুছে যায়।
“আমরা জানি না, তার দেহাবশেষ কোথায়। তারা লাশ সরিয়েছে, মিশিয়েছে নাকি অন্য কোথাও নিয়ে গেছে—কিছুই জানি না। আজ আমার বাবার কোনো কবর নেই।”
তিনি বলেন,
“জীবিত অবস্থায় আমাদের কাছ থেকে স্বজনদের কেড়ে নিয়েছে, আর মৃত্যুর পর আমাদের বিদায় জানানোর অধিকারও ছিনিয়ে নিয়েছে।”
বিশ্ব সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। তবু আজও হাজারো পরিবার জানে না—তাদের প্রিয়জনের দেহাবশেষ কোথায়, কিংবা আদৌ আছে কি না।