কয়েক মাসের টানটান উত্তেজনা ও সামরিক চাপের পর শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে ভেনেজুয়েলায় সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে দাবি করেন, অভিযানের পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক করে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে’।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা সরকার এই হামলাকে ‘মার্কিন সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারাকাসে হামলার পর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনার জেরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
কলম্বিয়া
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় বলেন,
“পুরো বিশ্বকে সতর্ক করছি—যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়েছে।”
তিনি আন্তর্জাতিক আইন, শান্তি ও মানবিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ ও আমেরিকান স্টেটস অর্গানাইজেশনের (ওএএস) জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন। পেত্রোর ভাষায়,
“এই মুহূর্তে কারাকাসে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। বিশ্বকে অবিলম্বে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।”
কিউবা
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যা দেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন,
“ভেনেজুয়েলার ওপর এই হামলা কেবল একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো অঞ্চলের শান্তির ওপর আঘাত।”
তিনি জরুরি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানান এবং কিউবার ঐতিহাসিক স্লোগান— ‘স্বদেশ অথবা মৃত্যু, আমরা জয়ী হবই’—দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।
ইরান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
রাশিয়া
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে এবং তা কোনো বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই হওয়া উচিত।
বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা ভেনেজুয়েলার জনগণ ও তাদের নেতৃত্বের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছি এবং উত্তেজনা কমাতে সংলাপের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানাই।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক প্রতিনিধি কাজা কালাস জানান, ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও কারাকাসে ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, “সব পরিস্থিতিতেই আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। সংযম প্রদর্শন জরুরি।”
স্পেন
স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভেনেজুয়েলায় উত্তেজনা হ্রাস ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি প্রয়োজনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে আগ্রহী বলেও জানানো হয়েছে।
ইতালি
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ইতালীয় নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা শুধু লাতিন আমেরিকাতেই নয়, বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। সামরিক সমাধানের পরিবর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সংলাপই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ—এমন মতই দিচ্ছেন অধিকাংশ দেশ।