মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রান্সআটলান্টিক জোটে নতুন করে ফাটল তৈরি হয়েছে, যা ন্যাটো-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র এই জোট থেকে সরে দাঁড়ায়, তাহলে ন্যাটোর অস্তিত্বই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটো মিত্রদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সদস্য দেশগুলোর কম প্রতিরক্ষা ব্যয় থেকে শুরু করে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের মতো বিতর্কিত বক্তব্য—সব মিলিয়ে জোটে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধেও ইউরোপীয় মিত্রদের অনীহা এই বিভাজনকে আরও গভীর করেছে।
ফ্রিডরিখ মের্ৎস এই পরিস্থিতিকে “ট্রান্সআটলান্টিক স্ট্রেস টেস্ট” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর বিশ্লেষক জিম টাউনসেন্ড বলেছেন, “ন্যাটো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভাঙনের কাছাকাছি।”
তবে বাস্তবতা হলো—চাইলেই যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে ন্যাটো ছাড়তে পারে না। এর জন্য সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন বা কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন, যা বর্তমানে কঠিন। কিন্তু তবুও ট্রাম্পের হাতে কিছু কার্যকর বিকল্প রয়েছে—যেমন ইউরোপে মোতায়েন প্রায় ৮৪ হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া, সামরিক সহযোগিতা কমানো বা ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জোট ছাড়ার আগেই এমন পদক্ষেপ ন্যাটোর কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। ইতালির সাবেক ন্যাটো রাষ্ট্রদূত স্টেফানো স্টেফানিনি বলেন, “শুধু বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিই জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”
অন্যদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলোও বসে নেই। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ-এর পর থেকে তারা প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে—২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই ব্যয় ৬২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, লজিস্টিকস ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘাটতি পূরণ করতে ইউরোপের অন্তত এক দশক সময় ও প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র না থাকলেও ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন কাঠামোয় ন্যাটো টিকিয়ে রাখতে পারে।
সময়ের চাপও কম নয়। জার্মান সামরিক প্রধানদের মতে, ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যেই রাশিয়া আবার শক্তি পুনর্গঠন করে ন্যাটো অঞ্চলে হুমকি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান সংকট ন্যাটোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—এই জোট কি আগের মতো টিকে থাকবে, নাকি নতুন রূপে গড়ে উঠবে?
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.