ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সোমবার নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। মাদক পাচারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে তার বিচার শুরু হচ্ছে। একই সময়ে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের এই নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের আইনগত বৈধতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
১৯৮৯ সালে পানামায় আগ্রাসনের পর এটিই লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সপ্তাহান্তে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে কারাকাসে অভিযান চালিয়ে মাদুরোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে তাকে আটক করে। যদিও মাদুরোর ১৩ বছরের শাসনামলের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনো ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন—প্রথমে কঠোর অবস্থান নিলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।
তেলের দিকেই যুক্তরাষ্ট্রের নজর
মাদুরোকে ‘স্বৈরাচারী’ ও ‘মাদক সম্রাট’ আখ্যা দিলেও ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ গোপন করেননি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ঘাটতি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
প্রথমে মাদুরোর আটকের ঘটনাকে ‘ঔপনিবেশিক তেল লুট’ ও ‘অপহরণ’ বলে আখ্যা দিলেও রোববার ভিন্ন সুরে কথা বলেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মানজনক ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন তার সরকারের অগ্রাধিকার।
রদ্রিগেজ বলেন,
“আমরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে সহযোগিতার একটি যৌথ এজেন্ডায় কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের জনগণ ও এই অঞ্চল যুদ্ধ নয়, শান্তি ও সংলাপ চায়।”
চাভেজপন্থী আন্দোলনের কট্টর মুখ হিসেবে পরিচিত হলেও রদ্রিগেজ বাস্তববাদী ও ব্যবসাবান্ধব নেতা হিসেবেও পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, তিনিই হতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সমঝোতার মুখ।
তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন—ভেনেজুয়েলা সহযোগিতা না করলে নতুন করে হামলা হতে পারে। একই সঙ্গে কলম্বিয়া ও মেক্সিকোকেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। কিউবার সরকার নিয়েও মন্তব্য করে বলেন, দেশটি “ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে”।
৬৩ বছর বয়সী সাবেক বাসচালক মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি কারাগারে আটক আছেন। সোমবার দুপুরে তাদের ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হবে। মাদুরোর বিরুদ্ধে মেক্সিকোর সিনালোয়া ও জেটাস কার্টেল, কলম্বিয়ার ফার্ক বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং ভেনেজুয়েলার অপরাধচক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’র সঙ্গে মিলে কোকেন পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
মাদুরো সব অভিযোগ অস্বীকার করে বরাবরই বলে আসছেন, এগুলো ভেনেজুয়েলার তেল দখলের ‘সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র’।
মাদুরো গ্রেপ্তার হলেও তার অনুগতরা এখনো ক্ষমতায় থাকায় দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ খাদ্য ও ওষুধ মজুত করছেন। রাস্তাঘাট তুলনামূলকভাবে ফাঁকা, সবাই অপেক্ষায়—এরপর কী হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে এই ঘটনার প্রভাব পড়েছে। ভেনেজুয়েলার বন্ডের দাম বেড়েছে, তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, আর প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে, ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ক্ষমতায় আনার ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, মাচাদোর “যথেষ্ট সমর্থন নেই”।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরো আটক হলেও ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। দেশটি কোন পথে এগোবে—তা নির্ধারিত হবে আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহে।