প্রায় এক দশক পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড—সব স্তরেই বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি বাড়বে পেনশন ও বৈশাখী ভাতার সুবিধাও।
এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের বাস্তবতায় এই বিপুল ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে কি না—তা নিয়েই দেখা দিয়েছে গুরুতর দুশ্চিন্তা।
১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৮টি বেতন কমিশন গঠিত হয়েছে। অতীতের কমিশনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে স্থায়ী বেতন কাঠামোর পরিবর্তে সীমিত পরিসরে ভাতা বৃদ্ধির পথেই থাকতে পারত। তাঁর ভাষায়,
“নির্বাচন সামনে রেখে পূর্ণাঙ্গ পে কমিশন ঘোষণা করা ঝুঁকিপূর্ণ। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়ন করা সহজ হতো। এখন ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে দিলে পরে তা পরিবর্তন করলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।”
বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগান দিতে সরকারকে মূলত রাজস্ব বিভাগের ওপরই নির্ভর করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই, নিয়মিতভাবে পূরণ হচ্ছে না নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্য।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন,
“এই পরিমাণ ব্যয় এক ধাপে বহন করা সম্ভব নয়। কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে (ফেজিং আউট) বাস্তবায়নই বাস্তবসম্মত। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। করনীতি ও করপ্রশাসনকে কার্যকরভাবে আলাদা করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বেতন বৃদ্ধি করলেই হবে না—সরকারি চাকরিজীবীদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও জনবল চাহিদার মূল্যায়ন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন,
“বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। তবে দক্ষতা মূল্যায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে শুধু বেতন বাড়ালে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।”
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কাও করছেন অর্থনীতিবিদরা।