বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মধ্যপ্রাচ্যে শাসনব্যবস্থা বদলানোর নীতির কঠোর সমালোচক হয়েও তিনি এবার ইরানে হামলা চালিয়েছেন, যা তার আগের বক্তব্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র আর “দেশ গড়ে দেওয়ার” নামে হস্তক্ষেপ করবে না। তার ভাষায়, আগের প্রশাসনগুলো জটিল সমাজে হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তিনি ইরানের বিরুদ্ধে “স্বাধীনতা আনার” কথা বলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালান—যা অনেকের চোখে জর্জ ডব্লিউ বুশ আমলের নীতিরই পুনরাবৃত্তি।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরান বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই যুদ্ধ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইসরায়েলের বেশি লাভ করছে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মরতাজাভির মতে, “এটি যুক্তরাষ্ট্রের বেছে নেওয়া যুদ্ধ, কিন্তু ইসরায়েলের চাপেই এটি শুরু হয়েছে।”
তিনি বলেন, ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ বললেও বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত তার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই দশকের বেশি সময় ধরে বলে আসছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে ইরান তা অস্বীকার করে আসছে এবং এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, তেহরান অস্ত্র তৈরির প্রমাণ নেই।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। এরপর নেতানিয়াহু নতুন করে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, এসব ক্ষেপণাস্ত্র একদিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—যার পক্ষে এখনো কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
ট্রাম্পও সাম্প্রতিক স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে এই বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্রাধিকার কমিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবু ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
এদিকে মার্কিন জনগণ নতুন যুদ্ধে যেতে আগ্রহী নয়। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের জরিপে মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ সমর্থন করেছেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, এতে মার্কিন সেনাদের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে তিনি বলেন, “এটি ভবিষ্যতের জন্য করা হচ্ছে।”
এই মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তিন দফা আলোচনা হয়। ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর পরিদর্শন মেনে নিতে রাজি বলে জানায়। ওমানি মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা ইতিবাচক বলেও উল্লেখ করেন।
কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয় ঠিক এই আলোচনার মাঝেই। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি বলেন, “নেতানিয়াহু সব সময় কূটনৈতিক সমাধান ঠেকাতে চেয়েছেন। এই যুদ্ধ তার জন্য বড় সাফল্য।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্পের শাসন পরিবর্তনের ভাষা গ্রহণ করা ইসরায়েলের জন্য জয়, কিন্তু আমেরিকান জনগণের জন্য ক্ষতি।”
অনেক মার্কিন রাজনীতিক ও বিশ্লেষক বলছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি হুমকি নয়। কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিব বলেন, “ট্রাম্প আমেরিকান জনগণের ইচ্ছা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অভিজাত ও ইসরায়েলি সরকারের স্বার্থে যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছেন।”
সব মিলিয়ে, বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিরোধী এবং এর মূল লাভবান হচ্ছে ইসরায়েল ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু—যুক্তরাষ্ট্র নয়।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.