যুদ্ধ–পরবর্তী গাজা পুনর্গঠনের জন্য একটি বৃহৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। তিনি জানিয়েছেন, গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ রয়েছে, যার কোনো বিকল্প পরিকল্পনা নেই। এই পরিকল্পনার আওতায় উপত্যকাজুড়ে ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ‘নিউ গাজা’ নামের এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এতে গাজাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কুশনার বলেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত না হলে দায় নির্ধারণ করা সহজ হবে। তিনি দাবি করেন, হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজার জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বড় বাধা সৃষ্টি হবে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘বোর্ড অব পিস’ সনদে স্বাক্ষরের পরপরই এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। গত অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে ঘোষিত ২০ দফা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পরবর্তী ধাপ হিসেবে এটিকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কুশনার জানান, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গাজা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পরে তিনি পুনর্গঠন পরিকল্পনার মূল দিকগুলো তুলে ধরেন।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, উপস্থাপনায় গাজার একটি মানচিত্র দেখানো হয়, যেখানে সমুদ্রতট বরাবর ‘উপকূলীয় পর্যটন অঞ্চল’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। সেখানে প্রায় ১৮০টি আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করা হবে, যার অধিকাংশ হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
গাজার দক্ষিণ-পশ্চিমে মিসরের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। বন্দরের কাছাকাছি একটি বিমানবন্দরের স্থানও নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ওই এলাকার কাছেই ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাজার পুরোনো বিমানবন্দর অবস্থিত।
পরিকল্পনায় ‘নিউ রাফাহ’ ও ‘নিউ গাজা’ নামে দুটি নগর উন্নয়ন প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। ‘নিউ রাফাহ’-এ এক লাখের বেশি স্থায়ী আবাসন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি সেখানে ২০০টির বেশি স্কুল এবং অন্তত ৭৫টি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন কুশনার। তাঁর দাবি, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ‘নিউ গাজা’কে একটি শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। কম্পিউটারে তৈরি উপস্থাপনায় শহরটিকে দোহা ও দুবাইয়ের মতো আধুনিক উপসাগরীয় শহরের আদলে দেখানো হয়—যেখানে আধুনিক অফিস ভবন, আবাসন এলাকা ও জলধারা থাকবে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার জবাবে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। অর্থায়ন প্রসঙ্গে কুশনার বলেন, প্রাথমিকভাবে সরকারগুলোই তহবিল জোগাবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে একটি সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রাথমিক ঘোষণা আসতে পারে।
তিনি বেসরকারি খাতকেও বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। কুশনার বলেন, ঝুঁকি থাকলেও বিশ্বাস রেখে বিনিয়োগ করতে হবে এবং এটিকে একটি ‘অসাধারণ বিনিয়োগের সুযোগ’ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনাও উঠেছে। ফিলিস্তিনি ইউরো-মেডিটেরেনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরের প্রতিষ্ঠাতা রামি আবদু এক্সে লিখেছেন, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ ও দমনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।