গাজায় চলমান যুদ্ধে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের পরিবারকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ফিলিস্তিন জার্নালিস্টস সিন্ডিকেট। সংগঠনটির দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসরাইলি হামলায় ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের অন্তত ৭০৬ জন স্বজন নিহত হয়েছেন।
শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সিন্ডিকেটের ফ্রিডমস কমিটি জানায়, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে ইসরাইল ‘সমষ্টিগত শাস্তি’ প্রয়োগ করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব মৃত্যু যুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; বরং সাংবাদিকতা দমন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত কৌশলের অংশ।
ফ্রিডমস কমিটির প্রধান মুহাম্মদ আল-লাহহাম বলেন, সাংবাদিকদের পরিবারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর মাধ্যমে ইসরাইল সাংবাদিকতার কাজকে এক ধরনের অস্তিত্বগত ঝুঁকিতে পরিণত করছে—যার মূল্য দিচ্ছেন স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও স্বজনরা।
তার ভাষায়, “এই হামলাগুলো প্রমাণ করে ইসরাইল সত্যের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালাচ্ছে—যেখানে ক্যামেরা আর শিশুর মধ্যে, কলম আর ঘরের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হচ্ছে না।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৪৩৬ জন, ২০২৪ সালে ২০৩ জন এবং চলতি বছরে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৭ জন সাংবাদিকের স্বজন নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাসের পরও এসব পরিবার হামলা থেকে রক্ষা পায়নি বলে জানানো হয়।
সিন্ডিকেট সম্প্রতি খান ইউনিসের কাছে একটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে জানায়, সাংবাদিক হিবা আল-আবাদলা, তাঁর মা এবং আল-আস্তাল পরিবারের প্রায় ১৫ জন সদস্যের মরদেহ প্রায় দুই বছর পর উদ্ধার করা হয়। পশ্চিম খান ইউনিসে তাদের বাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলার পর তারা নিখোঁজ ছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শত শত শিশু, নারী ও বৃদ্ধকে হত্যা করা হয়েছে শুধু পরিবারের কোনো একজন সদস্য সাংবাদিক হওয়ায়—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
সিন্ডিকেটের মতে, সাংবাদিকদের বাড়ি, বাস্তুচ্যুতির স্থান এবং গণমাধ্যমকর্মীদের বসবাসরত এলাকাগুলোতে বারবার হামলা চালানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর সাংবাদিকরা জীবিত থেকে সেই ধ্বংসের সাক্ষী হয়েছেন।
একে ইসরাইলি আচরণের ‘গুণগত পরিবর্তন’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যক্তি লক্ষ্যবস্তু থেকে সরে এসে এখন সমষ্টিগত শাস্তির পথে হাঁটছে ইসরাইল—যার উদ্দেশ্য সমাজকে ভয় দেখানো এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিবেশ ধ্বংস করা।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার পাশাপাশি মানসিক ক্ষতির দিকটিও তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্তান, জীবনসঙ্গী বা বাবা-মাকে হারানো সাংবাদিকরা গভীর মানসিক আঘাত, অপরাধবোধ ও পারিবারিক ভাঙনের মধ্যে পড়েছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে কাজ বন্ধ করতে বা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
ফিলিস্তিনি পর্যবেক্ষণ সংস্থা শিরিন ডট পিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ মাসে গাজায় প্রায় ৩০০ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন—গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১২ জন।
গণমাধ্যম স্বাধীনতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো এসব হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো ইসরাইলি সেনার বিরুদ্ধে সাংবাদিক হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার বা বিচার হয়নি।
ডিসেম্বরে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় ইসরাইল সবচেয়ে বেশি সাংবাদিক হত্যা করেছে।