স্বাধীন ও সমীক্ষাভিত্তিক গবেষণায় উঠে এসেছে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানে নিহত মানুষের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই গাজায় সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭৫ হাজার।
‘গাজা মর্টালিটি সার্ভে (GMS)’ নামে একটি জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণা, যা টি ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ -এ প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বলা হয়—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৭৫,২০০ জন সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। যা যুদ্ধ-পূর্ব গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.৪ শতাংশ।
এই সংখ্যা গাজা মিনিস্ট্রি ওফঃ হেলথ (MoH) প্রকাশিত একই সময়ের ৪৯,০৯০ জন নিহতের হিসাবের চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি।
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১,৬৬২ জনে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও নিহত হয়েছেন ৪৮৮ জন।
ইসরায়েল বরাবরই এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, চলতি বছরের জানুয়ারিতে একজন ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান—যুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারের কাছাকাছি বলে সেনাবাহিনীও মেনে নিচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্কদের হার ৫৬.২ শতাংশ, যা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই গবেষণায় ২ হাজার পরিবার (মোট ৯,৭২৯ জন) থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার প্রধান লেখক, লন্ডনের রয়্যাল হলোওয়ে, ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন -এর অধ্যাপক মাইকেল স্পাগাট বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মোটামুটি নির্ভরযোগ্য হলেও হাসপাতাল ও প্রশাসনিক কাঠামো ধ্বংস হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা নথিভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
আগের এক গবেষণায় (২০২৫ সালের জানুয়ারি) পরিসংখ্যানগত মডেল ব্যবহার করে নিহতের সংখ্যা ৬৪,২৬০ বলে অনুমান করা হয়েছিল। তবে নতুন গবেষণায় সরাসরি পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করে সেই সংখ্যা ৭৫ হাজার ছাড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া গবেষণায় ১৬,৩০০ জন ‘অসহিংস মৃত্যু’ শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮,৫৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়া ও জীবনযাত্রার অবনতির কারণে।
ই ক্লিনিক্যাল মেডিসিন -এ প্রকাশিত আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় মোট আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,১৬,০২০ জনে। এর মধ্যে ২৯ থেকে ৪৬ হাজার মানুষকে জটিল পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ডিউক ইউনিভার্সিটি ও গাজার আল-শিফা হাসপাতাল -এর চিকিৎসকরা। তাদের মতে, যুদ্ধের আগে যেখানে গাজায় মাত্র ৮ জন পুনর্গঠনমূলক সার্জন ছিলেন, সেখানে এখন কার্যকর অস্ত্রোপচার ব্যবস্থাই প্রায় নেই।
২০২৫ সালের মে পর্যন্ত গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১২টি সীমিতভাবে চালু রয়েছে। পুরো গাজার জন্য এখন হাসপাতালের শয্যা আছে মাত্র ২ হাজারের মতো, যেখানে যুদ্ধের আগে ছিল ৩ হাজারের বেশি।
গবেষকরা ‘গ্রে জোন’ নামে একটি নতুন বাস্তবতার কথাও উল্লেখ করেছেন—যেখানে কেউ সরাসরি বোমায় মারা না গিয়ে পরে সংক্রমণ, কিডনি বিকল বা চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন। এ ধরনের মৃত্যু প্রকৃত যুদ্ধজনিত মৃত্যুর পরিসংখ্যানকে আরও কম দেখাচ্ছে বলে মত গবেষকদের।
২০২৫ সালের শেষ দিকে গাজার ৮০ শতাংশ এলাকা জোরপূর্বক খালি করা হয়। উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয় আগস্টে। ফলে আহতদের বেঁচে থাকার সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা ও হামলা বন্ধ না হলে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে এবং লাখো মানুষ আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.