গাজায় ইসরায়েলের চলমান গণহত্যা ও এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব রাজনীতিকেও নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন আল জাজিরা ফোরামে অংশ নেওয়া শীর্ষ নেতারা। কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিত ১৭তম আল জাজিরা ফোরামে এই যুদ্ধের প্রভাবই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ফিলিস্তিন ইস্যুই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন এবং এটি এই অঞ্চলের “নৈতিক ও কৌশলগত দিকনির্দেশক”। তিনি বলেন, গাজায় যা ঘটছে তা কেবল যুদ্ধ নয়, বরং “নাগরিক জীবনকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা—এটি গণহত্যা।” তাঁর ভাষায়, এই সহিংসতা “মানবতার বিবেককে আহত করেছে” এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করেছে।
আরাঘচি আরও বলেন, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড শুধু ফিলিস্তিনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। তিনি সতর্ক করেন, যদি বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার দায়মুক্তি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তবে শক্তিই হবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল নীতি। ইসরায়েলের নীতিকে তিনি “সম্প্রসারণবাদী প্রকল্প” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর লক্ষ্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করা এবং স্থায়ী বৈষম্য তৈরি করা।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করতে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের বোর্ড চেয়ারম্যান শেখ হামাদ বিন থামের বিন মোহাম্মদ আল থানি বলেন, গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন ফিলিস্তিন প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক মোড় তৈরি করেছে। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েল গাজা পুনর্দখল ও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ বন্ধ করতে চায়। তিনি সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়টিও তুলে ধরেন এবং বলেন, সত্য তুলে ধরার কারণে বহু সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ বলেন, ফিলিস্তিন সংকট বিশ্ব ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। তিনি সতর্ক করেন, আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার দুর্বলতা বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে উত্তেজনা বাণিজ্য ও আফ্রিকার নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তুরস্কের যোগাযোগ দপ্তরের প্রধান বুরহানেত্তিন দুরান বলেন, গাজা যুদ্ধ প্রমাণ করছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “গণহত্যা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যতিক্রম নয়, বরং সহনীয় বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, শক্তির বদলে ন্যায়বিচারকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি করতে হবে।
ফোরামের আলোচনায় অংশ নেওয়া নেতারা একমত হন যে, গাজায় যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার নৈতিক ও আইনি ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফিলিস্তিন প্রশ্ন আবারও বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রে ফিরে এসেছে এবং এই সংকটের সমাধান ছাড়া টেকসই স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.