সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধ তৃতীয় বছরে গড়ানোর মধ্যেই দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। অনাহার, বাস্তুচ্যুতি ও সহিংসতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ। এর মধ্যেই সুদানের সরকারি বাহিনী সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ)-এর প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হবে না।
রোববার তুরস্কের আঙ্কারায় সুদানি কমিউনিটির সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে আল-বুরহান বলেন, রাজনৈতিক সমাধানের কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না যদি আরএসএফ নিরস্ত্র না হয়।
তিনি বলেন, “আমরা সামরিক সমাধানের কথা বলছি না—যুদ্ধ লড়াইয়ের মাধ্যমেই শেষ হতে হবে এমন নয়, আত্মসমর্পণের মাধ্যমেও যুদ্ধ শেষ হতে পারে।”
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইতোমধ্যেই সুদানে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মতে, এই সংঘাত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
রাজধানী খার্তুমের দক্ষিণে কোস্তি শহরে হাজার হাজার পরিবার খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে। খাবার বলতে অনেকের ভাগ্যে জুটছে শুধু রুটি আর সেদ্ধ ডাল।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গোটা সুদানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সুদান রেড ক্রিসেন্টের প্রতিনিধি আহমেদ আদম জানান, বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপ স্থানীয় সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। খাদ্য, ওষুধ—বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে।
এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায়। জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য মানবিক সহায়তার আবেদন অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে ২৩ বিলিয়ন ডলারে নামিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ বড় দাতাদের সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে—সুদানে খাদ্য সহায়তা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যেখানে ইতোমধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ক্ষুধার পাশাপাশি নতুন করে সামরিক অভিযান গ্রাম ও শহরগুলোকে জনশূন্য করে তুলছে। উত্তর দারফুর ও উত্তর কর্ডোফানে টানা সংঘর্ষে বহু এলাকা এখন কার্যত ‘ভূতুড়ে শহরে’ পরিণত হয়েছে।
উত্তর কর্ডোফানের কৌশলগত শহর এল-ওবেইদ দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে আরএসএফ। অন্যদিকে এসএএফ শহরটির চারপাশে প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে। এই অঞ্চলে কখনো আরএসএফ, কখনো এসএএফের দখলে যাচ্ছে শহর ও জনপদ—যাকে পর্যবেক্ষকরা ‘হিট অ্যান্ড রান’ যুদ্ধ কৌশল হিসেবে বর্ণনা করছেন।
দক্ষিণ কর্ডোফানের কাদুগলি ও দিল্লিং শহর প্রায় দেড় বছর ধরে আরএসএফের কঠোর অবরোধে রয়েছে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সংঘর্ষ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আরএসএফ ও তাদের মিত্ররা ড্রোন এবং দূরপাল্লার ভারী কামান ব্যবহার করে শহরগুলোর প্রতিরক্ষা ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে এবং বাস্তুচ্যুতি ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ থাকছে না।