ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর লাতিন আমেরিকায় আরও সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি কিউবার সরকারও শিগগিরই পতনের মুখে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
রোববার (স্থানীয় সময়) এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা—দুই দেশই বর্তমানে “চরমভাবে অসুস্থ” অবস্থায় রয়েছে। কলম্বিয়ার সরকারকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, বোগোতায় এমন একজন মানুষ দেশ চালাচ্ছেন, যিনি “কোকেন তৈরি ও যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করেন।”
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, “সে আর বেশিদিন এটা করতে পারবে না।”
সাংবাদিকরা যখন জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্র কি কলম্বিয়ায় সামরিক অভিযান চালাতে পারে—জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমার কাছে তো ভালোই শোনাচ্ছে।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে তিনি বলেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে তাদের “দাস ও চাকরের মতো আচরণ করা হবে।”
পেত্রো আরও বলেন, “মানব ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম দেশ, যারা দক্ষিণ আমেরিকার একটি রাজধানীতে বোমা হামলা চালিয়েছে।”
তবে তিনি প্রতিশোধের পথে না গিয়ে আঞ্চলিক ঐক্যের ওপর জোর দেন এবং বলেন, লাতিন আমেরিকাকে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যারা পুরো বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে—শুধু উত্তরের দিকে তাকিয়ে থাকবে না।
এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়, যখন শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে। ওয়াশিংটনের দাবি, এটি ছিল ২০২০ সালের মাদক-সন্ত্রাসবাদের মামলায় তাকে বিচারের আওতায় আনার জন্য একটি আইনশৃঙ্খলা অভিযান। তবে সমালোচকদের মতে, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ এখন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই। যদিও দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, ভেনেজুয়েলা “ভালো আচরণ” না করলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান চালাতে পারে।
কিউবা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে অনেক কিউবান নিহত হয়েছে এবং কিউবার ওপর আলাদা সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই, কারণ দেশটি এমনিতেই পতনের পথে।
তার ভাষায়, “কিউবা প্রস্তুত পতনের জন্য। তাদের কোনো আয় নেই। আগে ভেনেজুয়েলার তেল থেকে তারা আয় করত। এখন সেটা বন্ধ। কিউবা কার্যত ভেঙে পড়ার অবস্থায়।”
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে কিউবান-আমেরিকানদের অনেকেই খুশি হবেন।
মেক্সিকো নিয়েও কড়া ভাষায় কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “মেক্সিকোকে তাদের কাজ ঠিকভাবে করতে হবে। কারণ সেখান দিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকছে।”
যদিও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবামকে তিনি “দারুণ মানুষ” বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, প্রতিবার কথোপকথনে তিনি মেক্সিকোতে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
আল জাজিরার সাংবাদিক জন হোলম্যান জানান, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ট্রাম্প কার্যত ১৯শ শতকের মনরো ডকট্রিনকে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন, যার নাম দিয়েছেন তিনি—“ডন-রো ডকট্রিন”।
এদিকে ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, উরুগুয়ে ও স্পেন এক যৌথ বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর নজির স্থাপন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এসব হুমকি বাস্তবে রূপ দেবেন কি না—তা এখনও স্পষ্ট নয়। অনেকের ধারণা, সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে চাপ সৃষ্টি করে সরকার পরিবর্তনই তার মূল লক্ষ্য।
তবে বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ উইলসনের মতে, কলম্বিয়ার তুলনায় কিউবাই এখন বেশি ঝুঁকিতে। কারণ কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে এবং সেখানে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাবশালী কিউবান-আমেরিকান গোষ্ঠীর চাপও বড় বিষয়।