ইসরায়েলের নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে গাজা উপত্যকায় কাজ করা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে গাজার লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
খান ইউনুসের বাসিন্দা সিরাজ আল-মাসরি বুধবার আল জাজিরাকে বলেন, অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “আমাদের কোথায় যাওয়ার আছে? আমাদের কোনো আয় নেই, টাকা নেই। এখন হাতে গোনা কয়েকটি চিকিৎসাকেন্দ্র টিকে আছে। এগুলো বন্ধ হয়ে গেলে আহত ও রোগীদের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।”
ইসরায়েল ৩৭টি আন্তর্জাতিক এনজিওর লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেডিসিন সঁ ফঁতিয়ের (ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স- এমএসএফ), নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল, কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি। ইসরায়েল দাবি করছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী সংস্থাগুলোকে তাদের কর্মী ও কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তবে এসব সংস্থার বিরুদ্ধে হামাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত নয়।
গাজার আরেক বাসিন্দা রামজি আবু আল-নিল বলেন, “মানবিক সংস্থাগুলো থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ। যদি তাদের উপস্থিতি ও সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কী হবে তা আল্লাহই জানেন। অনেক শিশু মারা যাবে, অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে।”
এদিকে কানাডা, ফ্রান্স, জাপান ও যুক্তরাজ্যসহ ১০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে গাজায় আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, “এনজিওগুলোর কাজ বাধাগ্রস্ত করা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের ছাড়া জরুরি মানবিক চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব।”
যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও সহায়তা প্রবেশে বিধিনিষেধ অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজায় এক মিলিয়নের বেশি মানুষ শীতের মধ্যে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে জনগণ।
খান ইউনুসের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল-হাওয়াজরি বলেন, “গাজার অধিকাংশ মানুষ পুরোপুরি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।”
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তকে “মানবিক কার্যক্রমকে আরও সংকটে ফেলার পদক্ষেপ” বলে আখ্যা দিয়েছে। সংস্থাটির প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেন, এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি অবজ্ঞারই অংশ।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরের যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৫০০ ত্রাণকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক নিহত হয়েছেন। দীর্ঘ অবরোধের ফলে গাজায় ভয়াবহ খাদ্যসংকটও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা’-এর সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ওই পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে গাজায় ত্রাণ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলবে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.