গাজায় ইসরায়েলি দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকলে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন হামাসের বিদেশে থাকা রাজনৈতিক নেতা খালেদ মেশাল। তিনি বলেন, দখলদার জনগণের হাত থেকে অস্ত্র কেড়ে নিলে তারা “সহজ শিকার” হয়ে যাবে।
রোববার দোহায় আল জাজিরা ফোরামের দ্বিতীয় দিনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মেশাল বলেন, হামাসকে অস্ত্র সমর্পণে বাধ্য করার আলোচনা মূলত ফিলিস্তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করার শতাব্দীব্যাপী প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা।
তিনি বলেন, “যখন আমাদের জনগণ এখনো দখলদারিত্বের অধীনে রয়েছে, তখন নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা মানে আমাদের জনগণকে সহজে নির্মূলযোগ্য শিকারে পরিণত করা। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সব ধরনের অস্ত্রে সজ্জিত।”
তিনি আরও বলেন, “যদি এ বিষয়ে কথা বলতেই হয়, তাহলে আগে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে পুনর্গঠন ও ত্রাণ নিশ্চিত হবে এবং গাজা ও জায়নিস্ট রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হবে না। এটি একটি যৌক্তিক পন্থা। হামাস মধ্যস্থতাকারী কাতার, তুরস্ক ও মিসরের মাধ্যমে এবং পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এটি নিরস্ত্রীকরণের পথ নয়, বরং বড় পরিসরের প্রচেষ্টা প্রয়োজন।”
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাসকে “সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ”-এর আহ্বান জানিয়ে ব্যর্থ হলে পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন। তবে হামাস স্পষ্ট করেছে, ইসরায়েল গাজা দখল করে রাখলে তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে না।
গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে বলে জানায় ওয়াশিংটন। তবে তথাকথিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালাচ্ছে এবং পূর্ব গাজার তথাকথিত “ইয়েলো লাইন” থেকে সেনা প্রত্যাহারেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েল অন্তত ৫৭৬ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ১,৫৪৩ জনকে আহত করেছে।
মেশাল বলেন, “সমস্যা এই নয় যে হামাস বা প্রতিরোধ বাহিনী গ্যারান্টি দিতে পারছে না। সমস্যা হলো ইসরায়েল, যারা ফিলিস্তিনিদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে সেগুলো মিলিশিয়াদের হাতে তুলে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়।”
তিনি জানান, সামরিক শাখা বিলুপ্ত না করে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির প্রস্তাব দিয়েছে হামাস।
“হামাস পাঁচ থেকে সাত বা ১০ বছরের জন্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। এটি নিশ্চিত করবে যে অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো, যাদের সঙ্গে হামাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তারা এই নিশ্চয়তা দিতে পারে।”
সংঘাতের মূল কারণ প্রসঙ্গে মেশাল বলেন, “মূল বিষয়টি হলো দখলদারিত্ব এবং দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করা একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার অধিকার।”
তিনি বলেন, “দখলদার জনগণের জন্য প্রতিরোধ একটি অধিকার। এটি আন্তর্জাতিক আইন ও আসমানি ধর্মগুলোর অংশ। প্রতিরোধ জাতির স্মৃতির অংশ।”
মেশাল বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা একটি “টার্নিং পয়েন্ট” ছিল, যা ফিলিস্তিনি ইস্যুকে আবার বিশ্ব আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, “অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড ও এই গণহত্যামূলক যুদ্ধ বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—ফিলিস্তিনি সমস্যার সমাধান হতেই হবে।”
তিনি আরও বলেন, ১৫৯টি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে বা অনুমোদন করেছে, যা ভালো হলেও তা যথেষ্ট নয়।
“আমরা কীভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে বাস্তবে রূপ দেব—এটাই বড় প্রশ্ন।”
মেশাল আরব ও মুসলিম দেশগুলোকে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ‘রক্ষণাত্মক নীতি’ ছেড়ে ‘আক্রমণাত্মক নীতি’ গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আমরা চাই, ইসরায়েলকে একটি পরিত্যক্ত সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হোক—যা নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের জন্য বোঝা। ঠিক যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বৈধতা হারিয়েছিল।”
তিনি যোগ করেন, “আমরা ন্যায়ের পক্ষের মালিক, আর অভিযুক্ত হচ্ছে সেই পক্ষ যারা গণহত্যার যুদ্ধাপরাধ করেছে।”