ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে—তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইরান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের চ্যানেল এখনও খোলা রয়েছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) ইরান সরকার জানায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে ওঠা এই বিক্ষোভ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার জেরে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে।
ট্রাম্প রোববার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারে এবং তিনি দেশটির বিরোধী নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চললে যুক্তরাষ্ট্রকে “কঠোর সিদ্ধান্ত” নিতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী ও ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে রয়টার্স এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরান থেকে তথ্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোববার তেহরানের কারিজাক ফরেনসিক সেন্টারে তোলা যাচাইকৃত ভিডিওতে সারি সারি মরদেহের ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের দেখা গেছে। ইরান সরকার এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মৃত্যুর সংখ্যা জানায়নি। তবে রক্তপাতের জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং ইসরায়েল–সমর্থিত ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে মূলত নিরাপত্তা বাহিনীর মৃত্যুর খবরই গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন,
“আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে যোগাযোগের চ্যানেল খোলা আছে এবং প্রয়োজন হলে বার্তা আদান–প্রদান হয়।”
তিনি জানান, ঐতিহ্যবাহী মধ্যস্থতাকারী সুইজারল্যান্ডের মাধ্যমেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা “পরস্পরবিরোধী বার্তা” আন্তরিকতার অভাব দেখায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে তেহরানে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে আরাকচি বলেন, ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, আবার সংলাপের পথও খোলা রাখতে চায়।
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ তেহরানের এনকেলাব স্কয়ারে এক সমাবেশে বলেন, ইরান চারটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করছে—অর্থনৈতিক যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
আরাকচি দাবি করেন, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ৫৩টি মসজিদ ও ১৮০টি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, “কোনো ইরানি কখনো মসজিদে হামলা চালাতে পারে না।” তবে তেহরানের আবুজার মসজিদে হামলার সিসিটিভি ফুটেজ রয়টার্স যাচাই করেছে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন,
“ইরান আলোচনায় বসতে চায়। তারা ফোন করেছে। বৈঠক হতে পারে, তবে বৈঠকের আগেই পরিস্থিতির কারণে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।”
মঙ্গলবার ট্রাম্প তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে ইরান ইস্যুতে বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়, আলোচ্য বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সামরিক হামলা, গোপন সাইবার আক্রমণ, নিষেধাজ্ঞা জোরদার এবং সরকারবিরোধী শক্তিকে অনলাইন সহায়তা দেওয়া।
তবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হলে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে, কালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,
“ইরানের ওপর আক্রমণ হলে ইসরায়েল ও সব মার্কিন ঘাঁটি আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে।”
আরাকচি দাবি করেন, সপ্তাহান্তে সহিংসতা বাড়লেও বর্তমানে পরিস্থিতি “সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে” রয়েছে। তার মতে, ট্রাম্পের হুমকিই কিছু গোষ্ঠীকে সহিংসতায় উসকে দিয়েছে, যাতে বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিগগিরই ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করা হবে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–সমর্থিত ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ প্রতিবাদে সোমবার দেশজুড়ে সমাবেশ ডাকা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শহরে নিহত নিরাপত্তা সদস্যদের জানাজা ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.